আমাদের সদ্য কৈশোর পেরোনোর সময়ে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় বিডিনিউজের বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। বিজ্ঞাপনের ভাষা অনেকটা এমন ছিলো— কাগজের পত্রিকা পড়ছেন মানে আপনিও গাছ কাটছেন। মানে বিডিনিউজ একটা ডিজিটাল মাধ্যম, সুতরাং বিডিনিউজ পড়া মানে হচ্ছে কাগজ বাঁচানো, গাছ বাঁচানো।
(বিডিনিউজের কিন্তু একটা কাগজের বইয়ের পাবলিকেশন আছে। ওই কাগজ সম্ভবত গাছ থেকে আসে না; কিংবা উনারা হয়তো পড়ে “কাগজ পড়ছেন মানে গাছ কাটছেন” গোছের চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন।)
এতো বছর পরও ওই বিজ্ঞাপনের কপিটা মনে আছে। কিন্তু বিডিনিউজ কি ওই অর্থে কোনো দিনই গণমানুষের সংবাদ পাওয়ার গন্তব্য হয়ে উঠেছে? আমরা প্রথম প্রথম বিডিনিউজকে ভাবতাম অনেক বড় ব্যাপার— কিন্তু সেইটা ছিলো একটা সুন্দর মিথ, মুগ্ধতার আড়ালে ঢাকা পড়া মিথ্যা।
সময়ের সাথে সাথে বুঝেছি বিডিনিউজের নিজস্ব গোড়ামি ও এক্সট্রিমিজম আছে। তাদের ঘরানার লোক ছাড়া বিডিনিউজে কারো স্থান কম।
ওসমান হাদি খুন হওয়ার পর বিডিনিউজে একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিলো। সেখানে কোনো রকম প্রমাণযোগ্য সূত্র ছাড়াই লেখা হয়েছে, “মাদরাসায় পড়ালেখা করায় এবং ভাষা ও পোশাকের কারণে তিনি শিবির বা হিজবুত তাহরীরের কি না সেই সন্দেহ অনেকে প্রকাশ করতেন।” (এতো বাজে বাংলা বাক্য!)। অবশ্য পরের বাক্যেই বলা হয়েছে হাদি কোনো দলটল করতেন না বরং তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করতেন এবং কিছু বইও লিখেছিলেন।
আগে কল্পিত দোষ দেখায়ে পরে আবার সেইটাকে অস্বীকার করা; কাউকে ডিফেইম করার আদিম উপায়!
যা হোক প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে দেখলাম তাকে স্মরণ করে অনেক রকম লেখা চারপাশে। উনার মৃত্যুতে শোক রইলো। মৃত্যুই মানুষের অমোঘ গন্তব্য।
উনাকে বলা হচ্ছে “সাংবাদিকতার পথিকৃৎ”; এইটা কোন বিচারে জানি না। তবে ডিজিটাল বা চব্বিশ ঘণ্টার সাংবাদিকতায় উনি বিডিনিউজের মাধ্যমে কিছু অবদান অবশ্যই রেখেছেন। কিন্তু এইটা কখনো এই সত্য আড়াল করে না যে শেখ হাসিনার দুঃসহ ফ্যাসিজমে খালিদীর ভূমিকা ছিলো হাসিনার এক পরিপাটি সহচর।
উনার স্তুতি- গল্পগুলো দেখে সবার আগে এটাই মাথায় আসে। উনি যদি এতো বড় সাংবাদিকই হোন, উনার নীতি যদি ‘শুধুই সাংবাদিকতা’ই হয়ে থাকে, ওই ১৬ বছরে কেনো তিনি ফ্যাসিজমের ঝাণ্ডার নিচে ছিলেন? তখন উনার নীতি কোথায় ছিলো?
দূর থেকে দেখা খালিদীর চালচলন, তার কর্মীদের থেকে তার বিষয়ে শুনে মনে হতো তিনি নিজেকে মনে করতেন গার্ডিয়ানের সম্পাদক। মনে হতো তার একমাত্র নীতি হচ্ছে, নিজেকে এলিট দেখানো।
যদিও নিজের সংবাদমাধ্যমকে কখনো ওই অর্থে খুব বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু উনার ক্যারিশমা ছিলো। মাসের পর মাস আর্থিকভাবে স্ট্রাগল করলেও কর্মীদের ধরে রাখতে পেরেছেন। কর্মীদের কাছে নিজেকে এক ধরনের কাল্ট বানাতে পেরেছেন।
অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের (এর মধ্যে কেউ সিনিয়র সাংবাদিক) লেখায় উনার প্রশংসা ও তিরষ্কার দুটিই পাচ্ছি। কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে যারা বিডিনিউজের বাইরে সাংবাদিকতা করছেন, তাদের কাছে আসলে খালিদীর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিলো না।
বৃহত্তর জায়গা থেকে দেখলে উনি খুবই সাদামাটা একটা সম্পাদক জীবন কাটাইছেন। ভৃত্যগোছের কিছু লোকের কাছে “নাক উঁচু” বলে এক ধরনের কৃত্রিম প্রশংসা পেলেও তার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কাজের দেখা পাওয়া কঠিন। ফলে আমাদের কাছে, আমাদের বলতে বিডিনিউজের বাইরে যারা গত ১০-১২ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি, উনি প্রশংসা পাওয়ার কোনো সুযোগ রাখেন নাই, বরং উনি স্পষ্ট ফ্যাসিজমপ্রীতির জন্য তিরষ্কার প্রাপ্য।
- Saif Hasnat, Journalist