‘১২ মাস, ৩৬ সংস্কার’- এই স্লোগান সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। আবাসন সংকট সমাধান, হলের ক্যান্টিনে মানসম্মত খাবার, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, উন্নত পরিবহন, প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজেশন, গবেষণা ও ক্যারিয়ার সুবিধাসহ ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় প্যানেলটি। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পেয়ে ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্বভার নেন তারা।
এক বছর পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর তিন দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর নিজেদের এক বছরের কার্যক্রম ও জবাবদিহির প্রতিবেদন ‘খতিয়ান’ প্রকাশ করে ডাকসু।
ডাকসুর প্রকাশিত খতিয়ান, বিভিন্ন সময়ে নেওয়া উদ্যোগ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৬ দফার সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে সেবা চালু হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প বা প্রস্তুতি এগিয়েছে। আবার বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি এখনো শুধু পরিকল্পনা, দাবি বা প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।
আবাসনেই বড় ঘাটতি: ইশতেহারের তৃতীয় দফায় প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বৈধ সিট নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। অস্থায়ীভাবে হোস্টেল বা মাসিক আবাসন ভাতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নতুন হল নির্মাণের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পরও প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বৈধ সিট নিশ্চিত হয়নি। ডাকসু নেতারা ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্পের কথা বলছেন। পাঁচটি হল
ও বিভিন্ন হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগও সামনে এসেছে। তবে এগুলো এখনো প্রকল্প ও প্রক্রিয়ার পর্যায়ে।
এ ছাড়া আবাসন প্রকল্পটি ডাকসু নির্বাচনের আগেই পাস হয়েছিল। ফলে এটিকে ডাকসুর এক বছরের মেয়াদে নতুন করে বাস্তবায়িত নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
খাবারে প্রতিশ্রুতি, চালু হয়নি মিল ভাউচার: ইশতেহারের চতুর্থ দফায় পুষ্টিবিদের মাধ্যমে খাবারের মেনু প্রণয়ন, প্রতি তিন মাসে খাদ্যমান পরীক্ষা, প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া এবং অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিল ভাউচার’ চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল।
এক বছর পরও হলের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদও প্রকাশ্য বক্তব্যে খাবারের মান পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারার কথা স্বীকার করেছেন। ‘মিল ভাউচার’ও চালু হয়নি। তবে কলা ভবনে ক্যাফেটেরিয়া চালুর উদ্যোগসহ কিছু কাজ হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রেও বাস্তবায়ন রয়েছে আংশিক পর্যায়ে।
নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধায় কিছু অগ্রগতি: নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এক বছরে কয়েকটি দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে ডাকসু। পাঁচটি ছাত্রী হলে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি ডাকসুর ব্যবস্থাপনায় ১০ হাজার ছাত্রীকে ন্যাপকিন বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয় এবং এক বছরে ১০ হাজারের বেশি ন্যাপকিন বিতরণের কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া কলাভবনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, ছাত্রীদের জিমনেশিয়াম এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ইশতেহারের ষষ্ঠ দফায় ছাত্রীদের হলে প্রবেশের বিধিনিষেধ শিথিল, অনাবাসিক ছাত্রীদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে হলে প্রবেশের সুযোগ এবং অভিভাবকদের জন্য ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’ করার প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
অবশ্য হলের প্রবেশনীতি শিথিল ও ডিজিটাল করার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও হল প্রশাসনের অনুমোদন না পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডাকসু। চাইল্ড কেয়ার কর্নারের কাজও শেষ হয়নি। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও উপস্থিতির নিয়ম শিথিল করার প্রস্তাব সিন্ডিকেটে পাস হলেও মেয়াদ শেষে তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল।
শিক্ষক মূল্যায়নে প্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন: ইশতেহারের ১১ নম্বর দফায় শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ডাকসুর খতিয়ানে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি একাডেমিক ফোরামে পাস হয়ে সিন্ডিকেটে উত্থাপিত হলেও প্রশাসনের গড়িমসিতে বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর ডাকসু নিজ উদ্যোগে ‘ডিইউ টিচার্স ইভালুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ উদ্যোগের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে এটিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়নের বদলে ডাকসুর বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় নানা আয়োজন, স্থায়ী কাঠামো অনিশ্চিত: গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বছরে একাধিক কর্মশালা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে ডাকসু। ‘ইন্ট্রোডাকশন টু রিসার্চ’, ‘রিসার্চ প্রপোজাল ওয়ার্কশপ’, ‘ফ্রম ডিইউ টু অক্সফোর্ড’, ‘বিয়ন্ড বর্ডার্স: ইউএসএ’, ‘এডুকেশন এক্সপো’ ও ‘ইরাসমাস মুন্ডাস ফেস্ট’-এর মতো আয়োজনকে খতিয়ানে সম্পন্ন হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এ বছরের ২৪ জুন টিএসসিতে দুই দিনব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন এক্সপো’ হয়। এতে উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি, জব ফেয়ার ও সফট স্কিল উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সেশন ছিল। চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দাবিও করেছে ডাকসু। তবে গবেষণার যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে সিএআরএসের আধুনিকায়নের জন্য মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতে আবেদন এখনো প্রস্তাব বা দাবির পর্যায়ে। গবেষণা গ্র্যান্ট, রিসার্চ ট্রাভেল গ্র্যান্ট ও স্টার্টআপ সামিটের প্রতিশ্রুতিগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে- এমন স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
পরিবহনে কিছু পরিবর্তন, বড় প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ: পরিবহন খাতে ডাকসুর দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল নতুন রুট ও অতিরিক্ত ট্রিপ চালু করা। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কুমিল্লা রুটে সাপ্তাহিক বাস সার্ভিস চালু হয়। পরে শনিবার বাস ট্রিপ, বিভিন্ন রুটে সন্ধ্যার ট্রিপ এবং নারী হলগুলোর জন্য বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে ইশতেহারে জরাজীর্ণ বাস বাদ দিয়ে নতুন বাস কেনা, মোবাইল অ্যাপে রিয়েলটাইম ট্র্যাকিং এবং শাটল সার্ভিস চালুর কথাও ছিল। এক বছরের প্রতিবেদনে নতুন যানবাহন সংগ্রহের উদ্যোগ আটকে থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারের ২৩ নম্বর দফায় নিবন্ধিত রিকশা, নির্ধারিত ভাড়া এবং বহিরাগত যান নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিও ছিল। এক বছর শেষে নিবন্ধিত রিকশা ব্যবস্থা চালু হয়নি বলে ডাকসুর কার্যবিবরণীতে এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রকল্প, কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন: ইশতেহারের ১৮ নম্বর দফায় মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক- বিশেষ করে নারী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ- নিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তুরস্কের টিকার সহযোগিতায় প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকার মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন প্রকল্প চূড়ান্ত হয়। পরে ডাকসুর প্রতিবেদনে মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়ন, অ্যাম্বুলেন্স, এক্স-রে ও ইসিজি মেশিনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর উদ্যোগে নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
তবে মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নের প্রকল্পটি ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও টিকার সমঝোতায় শুরু হয়েছিল। ফলে পুরো প্রকল্পকে ডাকসুর নিজস্ব অর্জন হিসেবে দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আইনি সহায়তায় অগ্রগতি, পূর্ণাঙ্গ হেল্প ডেস্ক হয়নি: ইশতেহারের ২৯ নম্বর দফায় শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছিল। ডাকসুর খতিয়ানে ২৭০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে দেশের যে কোনো স্থান থেকে ঢাবি শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ ‘লিগ্যাল হেল্প ডেস্ক’ গঠনের প্রতিশ্রুতি প্রশাসনিক জটিলতায় বাস্তবায়িত হয়নি। হলভিত্তিক সমস্যা সমাধানে কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তবে ‘ন্যায়পাল’ ও ভিকটিম সাপোর্ট ব্যবস্থার মতো বৃহত্তর প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রমাণ নেই।
সংঘাতমুক্ত ক্যাম্পাসে অর্জন, বিচারপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ: ডাকসুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীলতার কারণে কোনো দিন ক্লাস বা পরীক্ষা বন্ধ হয়নি। গেস্টরুম-গণরুমও ফিরে আসেনি। সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি। তবে একই দফায় অতীতের হামলা ও নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। এ বিষয়ে স্মারকলিপি, কর্মসূচি ও বিচারের দাবি তোলা হলেও সব ঘটনার বিচার সম্পন্ন হওয়ার তথ্য নেই।
ডিজিটাল সেবায় সীমিত অগ্রগতি: লাইব্রেরির ক্ষেত্রে ১৪টি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ই-বুক, সাতটি উল্লেখযোগ্য জার্নাল এবং ২৯টি ই-রিসোর্সে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে লাইব্রেরি সম্প্রসারণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ডাকসুর ওয়েবসাইট উন্নয়ন ‘চলমান’ এবং হল ও একাডেমিক এলাকায় ওয়াই-ফাইয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দকে অগ্রগতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পেপারলেস রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, কেন্দ্রীয় ও হল লাইব্রেরির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে ই-লাইব্রেরির মতো প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ নেই।
কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে অন্তত ৩০ জনকে ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ইশতেহারে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মচারী মূল্যায়ন ব্যবস্থার কথাও ছিল। ফলে এ ক্ষেত্রেও পুরো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।
সংস্কৃতি, ক্যারিয়ার, প্রশিক্ষণসহ নানা আয়োজন: এক বছরে স্টার্টআপ সামিট, ক্যারিয়ার সেমিনার, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে ডাকসু। পরিবেশ সুরক্ষায় ডাস্টবিন স্থাপন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং শব্দদূষণবিরোধী কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
তবে ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতিই ছিল স্থায়ী কাঠামো ও নিয়মিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে। ফলে এককালীন আয়োজনকে সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
যেসব প্রতিশ্রুতি এখনো বড় প্রশ্ন: এক বছরের শেষে অস্থায়ী আবাসন বা আবাসন ভাতা, গার্ডিয়ান লাউঞ্জ, মিল ভাউচার, নিবন্ধিত রিকশা, ন্যায়পাল ও ভিকটিম সাপোর্ট সেল, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ল্যাংগুয়েজ রিসার্চ সেন্টার, আইএলইটি ল্যাব আধুনিকায়ন, প্রতিবন্ধীবান্ধব শ্রেণিকক্ষ ও বিশেষ ওয়াশরুম এবং হল কর্মচারীদের মূল্যায়ন পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণা গ্র্যান্ট, রিসার্চ ট্রাভেল গ্র্যান্ট, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা এবং পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।
ডাকসুর নিজস্ব প্রতিবেদনে কয়েকটি অসম্পূর্ণতার কথাও উঠে এসেছে। সিট বণ্টনে ডাকসুর প্রস্তাব উপেক্ষা করে একতরফা নীতিমালা, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু না করা এবং ক্যাফেটেরিয়ার মানোন্নয়নের লিখিত প্রস্তাব গ্রহণ না করার মতো বিষয় সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আমরা প্রতিটি দফা নিয়ে কাজ করেছি’: ডাকসুর এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি মুহা. মহিউদ্দীন খান কালবেলাকে বলেন, ৩৬ দফা সংস্কারের প্রতিটি কাজ পরিকল্পনা করে করা হয়েছে এবং কোনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা খতিয়ানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চলমান কাজকে কখনো বাস্তবায়ন হিসেবে দেখাইনি। কোন কাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লালফিতার দৌরাত্ম্য ও অসহযোগিতার কারণে আটকে আছে, সেটিও স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। প্রস্তাব বা দাবিকে সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে- বিষয়টি এত সরলীকরণ করা ঠিক হবে না।’
তার ভাষ্য, কয়েকটি ক্যান্টিনের টেন্ডার হয়ে গেছে এবং সাইকেল স্টোর, সাইকেল গ্যারেজ, মেডিসিন শপসহ বিভিন্ন স্থাপনার কাজ টেন্ডার পর্যায়ে রয়েছে। সাতটি অসম্পূর্ণ দফার ক্ষেত্রেও নীতিগত পর্যায়ে কাজ হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য, নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয়ে ডাকসুর পক্ষ থেকে নিয়মিত চাপ, আলোচনা ও আন্দোলনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
‘প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি’: সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্কসবাদী) ঢাবি শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর ডাকসু নির্বাচন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, এটি তাদের অধিকার ও শিক্ষা-স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু গত এক বছরে আবাসন, গবেষণা, নিরাপদ ক্যাম্পাস, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে প্রত্যাশিত ধারাবাহিক উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দলীয় এজেন্ডা প্রাধান্য পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আইয়ামও বলেন, আবাসন, নারী শিক্ষার্থীদের সমস্যা, নিরাপদ ক্যাম্পাস, পেপারলেস রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, ডাকসু অ্যাপ, লাইব্রেরি ও ডিজিটাল সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। তার দাবি, মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন ও ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্পের মতো কিছু কাজ ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কী কী ছিল: বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুনতাহা আলিফ বলেন, ‘ডাকসু এক বছরে অনেক কর্মসূচি নিয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর জায়গায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। আবাসন, হলের খাবার, পরিবহন ও প্রশাসনিক সেবায় আমরা স্থায়ী সমাধান দেখতে চেয়েছিলাম। উদ্যোগ আর বাস্তব ফলাফল এক জিনিস নয়।’
সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী মামুন অর রশীদ বলেন, ‘৩৬ দফার মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কতটি অনুষ্ঠান বা কর্মসূচি হয়েছে, সেটি দেখলে হবে না; প্রতিশ্রুতির স্থায়ী ফলাফল কতটা এসেছে, সেটিও দেখতে হবে। এক বছর শেষে আবাসন ভাতা, মিল ভাউচার, ডিজিটাল প্রশাসনিক সেবা বা নিবন্ধিত রিকশার মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক।’
‘৩৫-৪০ কোটি টাকার কাজ’: ডাকসুর হিসাবে, এক বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। তবে পুরো ব্যয়ের অডিট এখনো প্রকাশ হয়নি।
সব মিলিয়ে এক বছরে ডাকসুর উদ্যোগের সংখ্যা কম ছিল না। স্বাস্থ্য, পরিবহন, নারী শিক্ষার্থীদের কিছু সুবিধা, গবেষণা ও ক্যারিয়ারভিত্তিক আয়োজন, দক্ষতা উন্নয়ন, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগে দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড হয়েছে।
তবে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির মূল লক্ষ্য ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসূচি বা প্রকল্প শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা এখনো প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত ফল পাননি। আবাসন, খাবার, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পরিবহন, প্রশাসনিক সেবা, গবেষণা, ডিজিটালাইজেশন ও আইনি সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও ফলাফলের মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান ফারাক।
ফলে ‘১২ মাসে ৩৬ সংস্কার’ স্লোগানের এক বছর পর ডাকসুর খতিয়ান সামনে এলেও মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে- কতগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে, আর কতগুলো এখনো প্রকল্প, প্রস্তাব বা প্রক্রিয়ার মধ্যেই আটকে আছে।