রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ে সেইন্ট ক্রিস্টিনা চার্চের দোতলার খোলা জায়গা থেকে পিতলের ভারী ঘণ্টা চুরির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চার্চের পাল-পুরোহিত ফাদার কাজল জোয়াকিম গোমেজ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকালে চার্চটি পরিদর্শনে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দলটির নেতারা।
এসময় তাদের পাশে রেখেই ফাদার কাজল জোয়াকিম গোমেজ বলেন, ‘গত দেড় বছর আগে আমি সেন্ট ক্রিস্টিনা চার্চে পাল-পুরোহিত নিযুক্ত হয়েছি। আমি একই সঙ্গে সেন্ট পলস মিশন স্কুলের প্রিন্সিপাল। গত ১ তারিখে আমাদের চার্চের বেল (ঘণ্টা) চুরি হয়ে যায়। এবং এটা আমরা জানতে পারি ভোর সাড়ে ৫টার সময় এবং সঙ্গে সঙ্গে আমরা মোহাম্মদপুর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করি।’
থানা পুলিশের সহযোগিতা প্রশংসা করে পুরোহিত বলেন, ‘উনি (ওসি) সমস্ত উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সর্বতোভাবে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা অনেক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমাদের বেল উদ্ধার করে দিয়েছেন।’
চুরির ঘটনায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কথা জানিয়ে ফাদার কাজল বলেন, ‘এ কারণে বলা যায় যে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা খ্রিস্টান সম্প্রদায় কিছুটা উদ্বিগ্ন। এবং একই সঙ্গে আশার বাণী যে, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমাদের বেল উদ্ধার করেছে। তাই তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চার্চের কর্মী যারা রয়েছে, তারা সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। এবং একই সঙ্গে... আসিফ (এনসিপি নেতা) আমাদের ভাই এখানে সঙ্গে আছেন, এবং আপনারা যারা রয়েছেন, আপনারা সক্রিয়ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাই সমস্ত কিছুর জন্য আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এবং ভবিষ্যতে আপনারা আমাদের এভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন, যেন আমরা একসঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে পারি।’
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চার্চে গিয়ে ঘণ্টা চুরির বিষয়টি প্রথম বুঝতে পারেন ফাদার কাজল জোয়াকিম গোমেজ। তিনি দেখতে পান, সামনের ছোট গেটটি তালাবিহীন ও ভেড়ানো অবস্থায়। ওপরে তাকিয়ে দেখেন, দোতলায় থাকা ঘণ্টাটি নেই।
চার্চ কর্তৃপক্ষের হিসাবে ঘণ্টাটির ওজন ৫৫ থেকে ৬০ কেজি। পুলিশের হিসাবে এটি প্রায় ৭০ কেজি। পরে চার্চের সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা যায়, সিসিটিভি ক্যামেরায় রাত ১২টার পর আর কোনো রেকর্ড নেই। এরপর তারা মোহাম্মদপুর থানায় যোগাযোগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পরে গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১২টা ৩ মিনিটের পর কোনো এক সময় চোর বা চোরেরা ঘণ্টাটি নিয়ে যায়। ওই সময়ের পর চার্চের সিসিটিভি রেকর্ডিংও বন্ধ ছিল। ঘটনাস্থলের সরাসরি ফুটেজ না পাওয়ায় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ।
পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করার পর চোর বা চোরেরা ঘণ্টাটি ফেলে পালিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৫০ মিনিটে জাকির হোসেন রোডের একটি ময়লার ডাস্টবিনের পাশে সাদা পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ঘণ্টাটি পাওয়া যায়। এটি এখন থানা হেফাজতে রয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্ত ও গ্রেফতারের স্বার্থে তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। চার্চ কর্তৃপক্ষ থানায় মামলা করেছে। সিসিটিভি রেকর্ডিং কেন বন্ধ ছিল, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। চার্চের কেউ এটি বন্ধ করেছে, নাকি অন্য কেউ করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
ঘণ্টাটি কীভাবে চুরি করা হয়েছে, তার কিছু চিহ্নও পেয়েছে চার্চ কর্তৃপক্ষ। চার্চের কেয়ারটেকারের দায়িত্বে থাকা এক তরুণ জানান, চোর বা চোরেরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকে। সামনের তালা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তারা একদিক দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেও সেখানে তালা থাকায় অন্যদিক দিয়ে বারান্দায় ওঠে।
ওই তরুণের ভাষ্য, ওপরে ওঠার জায়গায় হাতের ছাপ ও কাদার দাগ পাওয়া গেছে। এরপর চোরেরা ঘণ্টাটি যেখানে রাখা ছিল সেখানে যায়। ঘণ্টাটি অনেক উঁচুতে বাঁধা ছিল। সেটি নামাতে ঘণ্টার জন্য রাখা মোটা দড়ি ব্যবহার করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফাদার কাজল জোয়াকিম গোমেজ বলেন, এত ভারী ঘণ্টা এত ওপর থেকে নামানো সহজ নয়। তার ধারণা, তিন-চারজন না হলে চোরেরা এটি নামাতে পারত না। ঘটনাস্থলে হাতের ছাপও পাওয়া গেছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ঘণ্টা চুরির ঘটনাটি সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অংশ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এটা তো হচ্ছে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আমরা শুধু এই ঘণ্টা চুরির ঘটনাটার কথা কিন্তু বলছি না। আমরা বলছি লাস্ট এক মাস আপনি দেখেন যে উপাসনালয়গুলোতে কীভাবে... এক জায়গায় একটা মাদ্রাসা লুট হলো, তারপরে এক জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর হলো। এই যে একটা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা অবনতি হয়েছে, এর ফলে কিন্তু এই ঘটনাগুলো ঘটতেছে।’
তিনি বলেন, ‘কনসার্নটা আরও বেশি কারণ সামনে কিছুদিনের মধ্যেই দুর্গাপূজা শুরু হতে যাচ্ছে। এবং এই সময়টাতে যদি এই ধরনের ঘটনা... রাষ্ট্রের জন্য, বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য, ইন্টারন্যাশনালি খুবই বাজে একটা পরিস্থিতি... বাজে ভাবমূর্তি তৈরি হতে পারে।’
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ‘তো এটা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আমি কোন নির্দিষ্ট ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে ফোকাস করছি না। তো এটা সার্বিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রিকভার করতে হবে এবং সরকারকে এটাকে এজ এ ক্রাইসিস নিয়ে... একটা ক্রাইসিস যেভাবে ম্যানেজ করা হয়, যেভাবে ইন্টার-গভর্নমেন্টাল, ইন্টার-মিনিস্ট্রিয়াল বা হচ্ছে যারা সংশ্লিষ্ট আছে সবাইকে সাথে নিয়ে মোকাবেলা করা হয়, সেভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।’
রাড্ডা দখল বা দখলের চেষ্টা এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনার সঙ্গে ঘণ্টা চুরির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘না, এটা তো হচ্ছে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু এই ঘণ্টা চুরির ঘটনাটার কথা কিন্তু বলছি না। আমরা বলছি লাস্ট এক মাস আপনি দেখেন যে উপাসনালয়গুলোতে কীভাবে... এক জায়গায় একটা মাদ্রাসা লুট হলো, তারপরে এক জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর হলো।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে এবং অপরাধ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘কিন্তু আমাদের ডিএমপির ডেটা তো সেটা বলছে না। আমার... ডেটা তো সেটা বলছে না। অপরাধের পরিমাণ বাড়ছে এবং অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি অপরাধ ঘটার আগেই আপনার যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, যথাযথ... সাথে সাথে যদি দেখা যায় যে একটা ঘটনা ঘটলেই আসামিরা গ্রেপ্তার হচ্ছে, তাহলে কিন্তু অন্য কেউ একটা অপরাধ করার আগে দুইবার চিন্তা করবে।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তো এই যখন যথাযথভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হবে, তখন এই ঘটনাগুলো বারবার ঘটতে থাকবে। আমাদের কনসার্নটা হচ্ছে ওই জায়গায়।’
শুক্রবার বিকালে চার্চ পরিদর্শনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় নাগরিক কমিটির রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য আদিব আরিফ ও সালেহউদ্দিন সিফাত, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নুসরাত তাবাসসুম, এনসিপির ধর্ম ও সম্প্রীতি সেলের সম্পাদক তারেক রেজা, ধর্ম ও সম্প্রীতি সেলের সহ-সম্পাদক প্রীতম দাস এবং স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ঢাকা মহানগর উত্তরের মোহাম্মদপুর থানাসহ আশপাশের থানার নেতাকর্মী এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সংগৃহীত আলামত ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।