Image description

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন- প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক এবং এতে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
 
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব বা ভাবনা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।  
 
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মোটা দাগে বেশ কয়েকটি দফার ওপর গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বক্তব্য রেখেছেন এবং কিছু রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেন, অন্তর্ভুক্ত হন এবং আলোচনায় আসেন। কারণ, আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণমূলক একটি সংশোধনী আনতে চাই।
 
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রস্তাব আসছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে কি না। যেহেতু এটা এক কক্ষবিশিষ্ট এবং আমাদের সংবিধানে বলা আছে- এটা একক, স্বাধীন, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র; এখানে কোনো অঙ্গরাজ্যের ব্যবস্থা নেই। সেই বিবেচনায় তারা বলেছেন, এটা কি পুনর্বিবেচনা করা যায়?
 
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা জুলাই জাতীয় সনদে একমত হয়েছি যে আমরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন করবো। সে হিসেবে আমরা যেতে চাই। তবে তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা পার্লামেন্টে বিবেচিত হলে সরকারি দল ও বিভিন্ন দল তা বিবেচনা করবে। তখন দেখা যাবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কী প্রক্রিয়ায়, কাদের নিয়ে এবং কোন পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হবে। কিছু প্রস্তাব জাতীয় সনদে আছে, কোথাও কোথাও ভিন্নমত আছে। আমরা বলেছি, বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেই।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিকল্পগুলো প্রণয়নের জন্য সবাইকে প্রস্তাব দিতে এবং পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেউ সংবিধানের প্রস্তাবনায়, কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের কথাও বলেছেন।
 
ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেসব বিষয়ে কিছুটা ছাড় দেওয়ার ইচ্ছা আছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় এলে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের কিছু কিছু অংশে তারা যদি ব্যত্যয় ঘটাতে চায়, সেটাও আলোচনা হতে পারে।
 
তিনি বলেন, তবে আমরা জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চাই। বিরোধী দলের কোথাও কোনো বক্তব্য থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু সেজন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কেউ ভালো কাজ করলে জনগণ চাইলে তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পারে- এটা তার অধিকার। তবে জুলাই জাতীয় সনদ হওয়ার সময় আমরা দলের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তখন দলের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি প্রস্তাবগুলো দিয়েছিলেন। পরে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনী ইশতেহারেও আমরা তা উল্লেখ করেছি। সুতরাং আমরা এই অবস্থান থেকে সরে আসিনি।

তিনি বলেন, পার্লামেন্টে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তখন আলোচনা হতে পারে। তবে আমরা এখনো আমাদের অবস্থানেই আছি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বাদ পড়া পাঁচটি সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনো চিন্তা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাকি সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন এখানে আনার সুযোগ এখন নেই।
 
তিনি বলেন, সরকার চাইলে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়ভিত্তিক আরও সংস্কার কমিশন গঠন করে পরামর্শ নিতে পারে। যেমন, মিডিয়া সংস্কার কমিশন গঠন করে এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে এগুলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করা। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় আমরা বলেছি, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধীদলকে অবশ্যই আলোচনায় রাখতে হবে। জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিরোধী দলকে আলোচনায় এনে তাদের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, তাহলেই সংশোধনটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

এছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, সবাই বলেছেন সংবিধান সংশোধন যেন দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন এবং নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধন করা হলে তা কম বিতর্কিত ও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত বলেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজন আছে কি না- এমন প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। আজকের আলোচনায় অতিথিরা এ বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, কমিটি আরও কয়েকটি অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সামনে আরও করবে। সবার মতামত বিবেচনা করেই উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা, এর আর্থিক ব্যয় ও দেশের জন্য এর কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে।

বৈঠকে একজন বক্তা বলেছেন, উচ্চকক্ষ হলে বিভিন্ন দল থেকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারেন এবং নির্দলীয় নাগরিক সমাজ আরও দুর্বল হতে পারে। তাই নির্দলীয় নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
 
বৈঠকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা এবং নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্য এক হলেও প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সরকার সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংশোধন চায়, আর বিরোধী দল চায় সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় সংবিধান ফিরিয়ে নেওয়া এবং রাষ্ট্রধর্মের বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়েছে।

উচ্চকক্ষের বিষয়ে অধিকাংশের মত, বর্তমান বাস্তবতায় এর প্রয়োজন নেই। এতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং নাগরিক সমাজের দলীয়করণের আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংসদ সচিবালয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমিটি সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আমন্ত্রণ জানাবে।

বৈঠকে আরও অংশ নেন আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েম, চরচা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান প্রমুখ।
 
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।