তপ্ত রোদে হাওরে ধান কাটতেন বাবার সঙ্গে। কখনো বাবার মাথার বোঝা কাঁধে তুলে নিতেন, কখনো মায়ের কাজে হাত লাগাতেন। দিনের পর দিন মাঠে কাজ করার পর রাতে বই নিয়ে বসতেন দুই ভাই রুবেল দাস ও রাহুল দাস। অভাব তাদের পড়াশোনার পথ আটকে দিতে পারেনি। কৃষিকাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে এখন দুজনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আলমনগর গ্রামের কৃষক রবীন্দ্র দাসের ছেলে রুবেল (৩০) ও রাহুল (২৮)। বড় ভাই রুবেল ২০২৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আর রাহুল ২০২৫ সালের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সম্প্রতি নিয়োগপত্র পেয়েছেন। শিগগির তিনি চাকরিতে যোগ দেবেন।
তবে শিক্ষকতার চাকরি পেলেই থামতে চান না দুই ভাই। ভবিষ্যতে কলেজে শিক্ষকতা করার লক্ষ্য নিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে কৃষিকাজও করেন।
রাহুল জানালেন, তাদের বাবার নিজের কোনো জমি ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তারা বাবার সঙ্গে বর্গা জমিতে চাষ করতেন। সারা দিন মাঠে কাজ করার পর সন্ধ্যায় বই নিয়ে বসতেন। নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে না পারলেও পরীক্ষায় ভালো ফল করতেন।
রাহুল ২০১৫ সালে বানিয়াচংয়ের শচীন্দ্র ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বড় ভাই রুবেলও ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন। পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকলেও কৃষিকাজের টান তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনত। সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতেন।
স্নাতক শেষ করে ডাক বিভাগে চাকরি পেয়েছিলেন রাহুল। কিন্তু চাকরির কারণে কৃষিকাজ ও পড়াশোনায় সময় দিতে পারছিলেন না। তাই চাকরিটি ছেড়ে দেন। তার ইচ্ছা ছিল, এমন একটি পেশায় যাবেন, যেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজও চালিয়ে যেতে পারবেন।
চার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জমির পাকা ধান কাটছিলেন রবীন্দ্র দাস। মেজো ছেলে রাহুলের সেলফিতে সবাই
রাহুল এরই মধ্যে ব্যাংকের ছয়টি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও তিনবার অংশ নিয়েছেন। অল্পের জন্য উত্তীর্ণ হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। বয়স থাকায় ভবিষ্যতেও বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে রুবেল এবং রাহুল বড়। ছোট ভাই তুষার স্নাতক শেষ করেছেন এবং হৃদয় একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। তাদের বোন রুবি ২০১৮ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দুর্ঘটনায় মারা যান।
রুবেল বললেন, একসময় তাদের কোনো জমি ছিল না। বাবা ও চার ভাই মিলে দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করে এখন হাওরে কিছু জমি কিনেছেন। ভবিষ্যতে আরও জমি কিনে বাবার কষ্ট কিছুটা কমাতে চান তারা।
রুবেল-রাহুলের পরিচিত সূর্য কুমার বৈষ্ণব বললেন, পড়াশোনায় ভালো হলেও দুই ভাই কৃষিকাজ কখনো ছাড়েননি। এখনো তারা মা-বাবার কাজে হাত লাগান এবং গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে সহযোগিতা করেন।
বাবা রবীন্দ্র দাস বললেন, ‘নিজে পড়াশোনার সুযোগ পাইনি। চাইনি ছেলেরা আমার মতো থাকুক। তাই কষ্ট করে হলেও তাদের পড়াশোনা করিয়েছি। এখন তারা শিক্ষিত হয়েও কৃষিকাজ করছে, এটা দেখলে খুব আনন্দ লাগে।’
মা সফলা রানী দাস জানালেন, অসুস্থ হলে দুই ছেলে রাত জেগে তার পাশে থাকে। কাজ থেকে ফিরে তার মাথায় তেল মেখে দেয়, রান্না করে। তার কথায়, ‘আমার ছেলেরা মাটির মানুষ।’
সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বললেন, কৃষক রবীন্দ্র দাসের সংগ্রাম ও সন্তানদের মানুষ করে তোলার চেষ্টা অনুকরণীয়। তার মতে, এই পরিবারের গল্প তরুণদের কঠিন পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।