Image description

শক্ত খুঁটির জোরে বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার একেএম এহসানউল্লাহ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন বরিশাল অঞ্চলের তৎকালীন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. হুমায়ুন কবির।

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার পর এসপি এহসানউল্লাহ নিজেই থানায় গিয়ে জিডিতে ঘটনাটি নোট করেন। একইসঙ্গে সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ফরমায়েশি কাজে জড়িত ছিলেন তিনি। 

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ুন কবিরের এ জবানবন্দি গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। 

প্রসিকিউশন জানায়, টিপু ও কবিরকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী হুমায়ুন কবির। ঘটনার সময় তিনি বরিশাল অঞ্চলের ডিআইজি ছিলেন। বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভারতে চিকিৎসাধীন থাকায় ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিতে পারেননি। তবে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আগেই জবানবন্দি দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী তার সেই জবানবন্দি মঞ্জুর করেন আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তৎকালীন ডিআইজি হুমায়ুন বলেন, ২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় ফলবাহী গাড়িতে আগুন দেন অজ্ঞাত লোকজন। ওই ঘটনায় ৯ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া থানায় একটি মামলা হয়। মামলাটি তদারকি করেন এসপি এহসানউল্লাহ। এছাড়া এ ঘটনায় কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারকে ঢাকা এবং কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ২টায় আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় তাদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, সকালে নিজ কার্যালয়ে গিয়ে হত্যার ঘটনাটি শুনে এসপি এহসানউল্লাহকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তাকে অপেশাদার কাজের জন্য ভর্ৎসনাও করা হয়। পরে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মনিরুল ইসলামের কাছে পুরো ঘটনা জানতে চাই। ওসি মনিরুল আমাকে জানান, টিপু-কবিরকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করলেও এসপির নির্দেশে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঠানো হয়। আগৈলঝাড়া থানার পুলিশকে তাদের ক্রসফায়ারে দেওয়ারও নির্দেশ দেন এহসাউল্লাহ। তবে কেউ রাজি না হওয়ায় অন্য থানার পুলিশ সদস্যদের দিয়ে বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ড সংঘটন করেন এসপি।

নিজের জবানবন্দিতে সাবেক এই ডিআইজি উল্লেখ করেন, এ হত্যাকাণ্ডের পর থানায় হাজির হয়ে নিজেই নির্দেশনা দিয়ে জিডিতে নোট করেন এসপি এহসাউল্লাহ। তবে আগৈলঝাড়া থানার কোনো সদস্য এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন না বলে ওসির বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ পাই। উজিরপুর থানার দুজন পুলিশ সদস্যকে দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এসপি। ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর পাশাপাশি অপেশাদার কাজের জন্য ২০১৫ সালে তার এসিআরে বিরূপ মন্তব্য সংযোজনীসহ পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানো হয়। এটি এসপির অপেশাদার কাজকর্মের প্রতি আমার খারাপ ধারণার একটি দালিলিক প্রমাণ। শুধু তাই নয়, অপেশাদার এই এসপিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রেঞ্জ থেকে অন্যত্র বদলির জন্য অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মাগুরা জেলায় বদলি করা হয়।

হুমায়ুন কবির বলেন, এহসানউল্লাহর এসিআরে বিরূপ মন্তব্যের জেরে অন্যত্র বদলি করার পরও অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতি পেয়ে ফের বরিশাল রেঞ্জে আসেন। কারণ তার খুঁটির জোর বেশ শক্ত ছিল। বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর অত্যন্ত আস্থাভাজন ও প্রিয় পাত্র ছিলেন তিনি। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হয়ে নিজের পেশার বাইরে গিয়ে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ফরমায়েশি কাজে লিপ্ত হন এহসানউল্লাহ। এমপির নির্দেশে আমাদের অগোচরে তিনি অনেক কাজ করতেন।

তিনি বলেন, শক্ত খুঁটির জোরে এসপি এহসানউল্লাহ বেপরোয়া হয়ে এসব অপেশাদার কাজকর্ম করার সাহস পেয়েছেন। সেই অজানা শক্তির কারণেই ক্রসফায়ার করার মতো ঘটনা ঘটানোর সাহস পেয়েছেন বলে আমি মনে করি।

এ মামলায় চার আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তারা হলেন- উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। আবুল হাসানাত ও এহসান পলাতক রয়েছেন।