Image description

শরীরের একটি অংশ ক্যামেরার সামনে তুলে ধরলেন নারীটি। সেখানে কয়েকটি কালচে দাগ। তাঁর দাবি, সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে এই ক্ষত করা হয়েছে। অনৈতিক কাজে রাজি না হওয়ায় মারধর করা হয়েছে, নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

মিসরের একটি গোপন আশ্রয় থেকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কাছে সম্প্রতি পাঠানো এক ভিডিওতে এভাবেই নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন মানব পাচারের শিকার এক বাংলাদেশি নারী। একই চক্রের হাতে পাচার হওয়া আরেক নারীর অভিযোগও প্রায় একই—ইতালি পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার পর তাঁদের মাসের পর মাস ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত এক রাতে ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে দুজন পালিয়ে যান। পালানোর সময় সঙ্গে নিতে পারেননি পাসপোর্ট, মুঠোফোন কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। তাঁদের অভিযোগ, সেগুলো এখনো মানব পাচার চক্রটির হাতে।

নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে দুই নারীর নাম প্রকাশ করা হলো না।

এই দুই নারীর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোহাম্মদ আরজু রহমান (৪৭)। এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার রাজধানীর বনানী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বাহিনীটির দাবি, তিনি একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের অন্যতম মূলহোতা।

‘দেড় বছর ধরে ফেলে রেখেছে’

দুই নারীর একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে মিসরে নেওয়ার পর ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এরপর বৈধ পথে ইতালি পাঠানো হবে।

এই আশ্বাসেই এই নারী দেশ ছাড়েন। কিন্তু মিসরে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁকে সেখানে আটকে রাখা হয়। তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন নিয়ে নেওয়া হয়। একই ঘরে রাখা হয় আরেক বাংলাদেশি নারীকে। তাঁর অভিযোগ, এরপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

ভিডিওতে এই নারী বলেন, ‘আমাদের ঘরের মধ্যে আটকায় রাখছে। আমার মোবাইল, পাসপোর্ট সব আটকায় রাখছে।’ এরপর আরও গুরুতর অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরের কিছু পুরুষকে এনে তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। তাঁদের এমন কিছু কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা রাজি ছিলেন না।

রাজি না হওয়ায় মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওই নারীর। একপর্যায়ে নিজের শরীরের দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এই যে দেখেন, সিগারেটের ছ্যাঁকা দিছে।’

এসআরবির তথ্যেও চক্রটির বিরুদ্ধে নারীদের জিম্মি করে রাখা, অনৈতিক কাজে বাধ্য করা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং সিগারেট দিয়ে শরীরে ক্ষত করার অভিযোগ রয়েছে।

নির্যাতনের ভিডিও ধারণ, মুখ খুললে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

ওই নারীর অভিযোগ, নির্যাতনের সময় ভিডিও ধারণ করা হতো। পরে সেই ভিডিওকেই তাঁদের চুপ করিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাঁদের বলা হয়েছিল, ঘটনা প্রকাশ করলে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। পরিবারের সম্মান নষ্ট করা হবে। এই ভয়েই দীর্ঘ সময় কাউকে কিছু বলেননি তাঁরা।

নারীটি বলেন, ‘মানসম্মানের ভয়ে কিছুই বলি নাই। সহ্য করে ছিলাম। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম, কীভাবে পালাব।’

অভিযোগ অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়ার পরও হুমকি বন্ধ হয়নি। চক্রটির কাছে তাঁদের ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য নথি রয়ে গেছে। সেগুলো ব্যবহার করে তাঁদের এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ওই নারী বলেন, এত দিন চুপ থাকলেও এখন আর নীরব থাকার সুযোগ দেখছেন না।

‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’—এভাবে নিজের পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, মানসম্মানের ভয়ে চুপ থাকলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে।

এক রাতে খুলে যায় পালানোর পথ

দীর্ঘদিন ধরে সুযোগ খুঁজছিলেন দুই নারী। এক রাতে যে বাসায় তাঁদের রাখা হয়েছিল, সেখানে কেউ ছিল না। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, আর অপেক্ষা নয়। রাতের অন্ধকারে দুজন একসঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। পালানোর তাড়াহুড়ায় পাসপোর্ট, মুঠোফোনসহ অনেক কিছুই রেখে আসতে হয়।

এরপর অন্য একটি বাসায় আশ্রয় নেন ভুক্তভোগীরা। সেখান থেকে পরিবারের সদস্য এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। পরিবারের সদস্যরাও বাংলাদেশে অভিযোগ করেন।

ভিডিওতে আশ্রয়ের জায়গা দেখিয়ে এক নারী বলেন, তাঁরা এখন সেখানে ‘দুর্বিষহ জীবন’ কাটাচ্ছেন।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা কয়েকজন ভুক্তভোগী ভিডিও বার্তায় পরিবারের সদস্যদের কাছে তাঁদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন। মিসরে আরও কয়েকজন নারী আটকে রয়েছেন বলেও তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

৬ লাখ টাকা, এরপর এক হাজার ডলার

অন্য নারীর বর্ণনায় উঠে আসে প্রতারণার আরেক চিত্র। তাঁর দাবি, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তাঁর কাছ থেকে প্রথমে ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর কাছে থাকা এক হাজার মার্কিন ডলারও নিয়ে নেওয়া হয়। তাঁর হিসাবে সব মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ টাকা গেছে।

অন্য নারীর কাছ থেকেও প্রথমে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। পরে আরও তিন হাজার মার্কিন ডলার নেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি। ডলার নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসা হয়ে যাবে। কিন্তু ভিসা হয়নি।

এরপর তাঁদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ ওই নারীর। তিনি বলেন, দূতাবাসে নিয়ে যাওয়ার এবং ইতালির ভিসার ব্যবস্থা করার কথা বললে তাঁদের মারধর করা হতো। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা বলছি, আমাদের এম্বাসিতে দাঁড় করান। এই কথা বলার পর আবার মারা শুরু করছে।’

‘অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেবে’—এই কথা শুনেই ভয়

দ্বিতীয় নারী বলেন, আটকে থাকার সময় তাঁরা এমন কথাও শুনেছেন যে তাঁদের অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতে পারে। এই কথাই তাঁদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, নিজের কানে তাঁদের ‘বিক্রি করে দেওয়ার’ কথা শুনেছেন। এরপর সেখানে আর থাকা নিরাপদ মনে হয়নি।

প্রথম নারীর অভিযোগও একই ধরনের। তাঁর দাবি, আরও অনেক নারীকে বাংলাদেশ থেকে এনে মিসরে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ অনৈতিক কাজে বাধ্য হয়েছেন, কাউকে আবার অন্য দালালের কাছে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এসআরবি জানিয়েছে, এই চক্র বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার বেকার যুবক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের লক্ষ্য করত। ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হতো।

এ ঘটনায় মোহাম্মদ আরজুর রহমান নামে এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি বলেছে, তিনি এই মানব পাচার চক্রের হোতা
এ ঘটনায় মোহাম্মদ আরজুর রহমান নামে এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি বলেছে, তিনি এই মানব পাচার চক্রের হোতাছবি: সংগৃহীত

‘ইতালি’ ছিল প্রলোভন, গন্তব্য বদলাত বারবার

দুই নারীর বর্ণনা এবং এসআরবির তথ্যে পাচারের একটি ধরন স্পষ্ট হয়। প্রথমে ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালিতে ভালো বেতনের চাকরি বা বৈধভাবে যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো। ভিসা ও অন্যান্য নথির কথা বলে নেওয়া হতো টাকা। এরপর বাংলাদেশ থেকে বের করার পর পরিকল্পিত গন্তব্য পাল্টে যেত।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ভুক্তভোগীকে সার্বিয়া ও বেলারুশ হয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে ভুক্তভোগীদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিসর কিংবা লিবিয়ায় এবং সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো।

দুই নারী অবশ্য শেষ পর্যন্ত ইউরোপে পৌঁছাতে পারেননি। তাঁদের একজনের ভাষায়, ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের ‘মিসরের মাটিতে এনে ফেলে রাখা হয়েছে’।

টাকা নয়, আগে নিরাপদে ফেরার অপেক্ষা

ভিডিওতে দ্বিতীয় নারী বারবার তাঁদের দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁরা দরিদ্র পরিবারের সদস্য। বিদেশে গিয়ে আয় করার আশায় কষ্ট করে এই টাকা জোগাড় করেছিলেন।

‘আমরা অসহায় মেয়ে, গরিব মানুষ’—বলে সরকারের কাছে টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করার আবেদন জানান ওই নারী। তবে তাঁদের বক্তব্যে টাকার চেয়েও বড় হয়ে এসেছে নিরাপত্তার বিষয়টি।

কারণ, তাঁরা এখনো বিদেশে। পাসপোর্ট তাঁদের হাতে নেই। অন্যদিকে তাঁদের দাবি অনুযায়ী, যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁদের কাছে এখনো ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও রয়েছে।

প্রথম নারী বলেন, ‘আমরা কোনো রকম জানটা নিয়ে পালিয়ে আসছি।’

দুই হাজারের বেশি ভুক্তভোগীর আশঙ্কা

এসআরবি জানিয়েছে, আরজু রহমানকে গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। এনএসআইয়ের সঙ্গে আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগী যোগাযোগ করেছেন।

মামলা, অভিযোগ এবং পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে।

ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে জানিয়েছে এসআরবি।

এসআরবি বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আরজু রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। তাঁর একটি ব্যাংক হিসাবে গত এক বছরে ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫০ টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। আরজু রহমানকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।

মানব পাচার চক্রের হাতে পাচার হওয়া এই দুই নারী এখন ফেরার অপেক্ষায়। মিসরে থাকা এক নারীর ভাষায়, এত দিন ‘মানসম্মানের ভয়ে’ তাঁরা চুপ ছিলেন। এখন তাঁদের চাওয়া—নিরাপদে দেশে ফেরা এবং যাঁরা তাঁদের এই পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছেন, তাঁদের বিচার।