Image description

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, গঠনপ্রক্রিয়া ও কাঠামো নিয়ে আরও আলোচনা এবং বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাব প্রয়োজন। সবার মতামত বিবেচনা করে যে প্রস্তাব উপযুক্ত মনে হবে, তা সংসদে বিবেচনা করা হবে।

তিনি বলেন, ‘এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি—কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হবে।’

গণমাধ্যমের মতামত

বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল, বার্তা ব্যবস্থাপনা ও টকশোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্ত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, এর আগে সম্পাদক, সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুই দিন আলোচনা হয়েছে। যারা লিখিত প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলোও পর্যালোচনা করা হবে। পর্যায়ক্রমে যেসব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার কথা রয়েছে, তাদের সবার মতামত নেওয়া হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকের বৈঠকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বেশ কিছু মূল্যবান মতামত পেয়েছি, যেগুলো কমিটির বৈঠকে বিবেচনা করা হবে।’

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলামসহ দেশের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধি এবং টকশোতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন।

জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও আলোচনা

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ এবং জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক শক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ ছাড়া গত ১৭ বছরে ‘বঞ্চনার শিকার’ হয়েছেন এমন ব্যক্তি ও তাদের পরিবার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সঙ্গেও আলোচনা করবে কমিটি।

সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সঙ্গেও কমিটি আলোচনা করবে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়েও মতামত

বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও মতামত এসেছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, কেউ কেউ বাংলাদেশের মতো একক রাষ্ট্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এ বিষয়ে কেউ নতুন প্রস্তাব দিলে তা সংসদে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আরও প্রস্তাব চায় কমিটি

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিভিন্ন ধাপ ও সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে আরও প্রস্তাব চাওয়ার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। কোথাও কোথাও ভিন্নমতও রয়েছে।

তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে কোন ধাপ বা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সে বিষয়ে বিকল্প প্রস্তাব প্রয়োজন। আলোচনার পর যে প্রস্তাব উপযুক্ত মনে হবে, তা সংসদে বিবেচনা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের মেয়াদ নিয়ে ভিন্নমত

প্রধানমন্ত্রীর পদে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে ভিন্নমত এসেছে বলে জানান বিশেষ কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, কেউ কেউ মনে করেন, ১০ বছরের মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কোনও প্রধানমন্ত্রী ভালো করলে জনগণ তাকে আবারও নির্বাচিত করার সুযোগ থাকা উচিত—এমন মতামতও এসেছে।

তবে নিজেদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় এবং পরবর্তী নির্বাচনি ইশতেহারেও তাদের দল প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গা থেকে এখনও সরে আসিনি। তবে সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনও প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’

বিরোধী দলকে আলোচনায় আসার আহ্বান

বিশেষ কমিটির আলোচনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, ‘আলোচনা উন্মুক্ত। বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেন, অন্তর্ভুক্ত হন এবং আলোচনায় আসেন।’

সবার সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধান সংশোধনী আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

নতুন সংস্কার কমিশনের সুযোগ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ১১টি সংস্কার কমিশনের সবগুলোর সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তি ছিল ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন। এগুলো হলো—সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন।

বাকি সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় না এলেও সরকার চাইলে বিভিন্ন বিষয়ে নতুন করে সংস্কার কমিশন গঠন করে মতামত নিতে পারে বলে জানান তিনি। উদাহরণ হিসেবে মিডিয়া সংস্কার কমিশনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রতিবেদন

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হবে বলে জানান কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, পরে সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এর ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিল আনা হলে সংসদ ও সংসদের বাইরে আবারও মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী প্রণয়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।