Image description

একটি গণতান্ত্রিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে স্বাধীন চিন্তাচর্চা, বই প্রকাশনা ও ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ চর্চার ওপর। অথচ শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রির কারণে ঢাকার বাংলাবাজারে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর বিক্রয়কেন্দ্রে তালা লাগিয়ে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানটির দুজন কর্মীকে তুলে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা শুধু উদ্বেগের নয়, বরং চরম বিস্ময়ের ও আতঙ্কের! এই ঘটনা দেশের জন্য উদ্বেগজনক। 

ইউপিএল কোনও সাধারণ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নয়; সাধারণ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হলেও যে সেটার ওপর চড়াও হওয়া যাবে এমন নয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের মেধা, ইতিহাস, গবেষণা ও প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশে ইউপিএলের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজবিদ্যার নানা গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিকে কেন্দ্র করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলো, সেটি কেবল শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনী নয়; এটি অবিভক্ত বাংলা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য। 

যে কোনো বই, এমনকি এই বই নিয়ে কিংবা স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্য নিয়ে সমাজের কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ভিন্নমত থাকতেই পারে; চিন্তার জগতে সেই ভিন্নমতের জবাব দিতে হয় আলোচনা, তর্ক বা পর্যালোচনার মাধ্যমে। কিন্তু তা না করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে দোকানে তালা ঝোলানো কিংবা বিক্রয়কর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া স্পষ্টতই মব সন্ত্রাসের নিকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ, যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দেশে ‘মব কালচার’ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন। 

প্রকাশনার কর্মীরা কেবল তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন; বই বিক্রি করা বা দোকানে কাজ করা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। কোনো অপরাধ ছাড়া নিছক একটি বই বিক্রির কারণে শ্রমজীবী মানুষদের আইনি হয়রানির শিকার হতে হওয়া চিন্তাচর্চা ও মেধাভিত্তিক পেশার ওপর সরাসরি আঘাত।

ইতিহাসের পথপরিক্রমায় নানা শাসন ব্যবস্থা এসেছে ও গিয়েছে। কিন্তু যে সমাজে বই প্রকাশ, পাঠ ও বিক্রির কারণে দোকানে তালা ঝোলানো হয়, সেই সমাজ দিন দিন অন্ধকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী এক সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। আজ ইউপিএলের মতো একটি আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে যদি এমন অরাজকতা চালানো সম্ভব হয়, তবে আগামীকাল অন্য যে কোনো স্বাধীন ও মুক্তমত চর্চার স্থান একই আক্রমণের শিকার হতে পারে।

আওয়ামী লীগের আমলেও আমরা এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী তৎপরতা দেখেছি। আদর্শ প্রকাশনীর তিনটি বই আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই বইমেলায় তাদের স্টল বন্ধ করে দিয়েছিল। এখানে বলে রাখা দরকার, স্রেফ সরকারের সমালোচনা করার কারণে আইনিভাবে কোনো বই নিষিদ্ধ করা কতটুকু যৌক্তিক? এ ধরনের পদক্ষেপ সরাসরি চিন্তাচর্চাকে বাধাগ্রস্ত করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যা শেষতক কর্তৃত্ববাদী সরকারের উত্থান ঘটায়। তা ছাড়া ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের ক্ষেত্রে এখনও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যদিও তা হবে এই সরকারের আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত। 

একটি সংবেদনশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বইয়ের ওপর আঘাত মানেই শিক্ষার ওপর, মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ধরনের মব তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রতিষ্ঠানটি যাতে নির্বিঘ্নে তাদের প্রকাশনা ও বিপণন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপট বা রাজনৈতিক টানাপোড়েন যেন জ্ঞানচর্চা ও ইতিহাসের পথ রুখে দাঁড়াতে না পারে– এটিই আমাদের প্রত্যাশা। আশা করি, সরকার এ ধরনের মববাজ কিংবা মবের ঘটনাগুলো যাতে না ঘটে, তার জন্য আগাম তৎপরতা জারি রাখবে। এতে সমাজে আগ থেকেই সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মববাজদের বিরুদ্ধে একটা জোরালো বার্তা যাবে। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল