Image description

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শনিবার বলেছেন, ‘পুলিশের কেউ কেউ ফ্যাসিবাদদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ রাখছেন। নানা ধরনের তথ্য দিচ্ছেন।

শৃঙ্খলা না মানলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সরকারের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের।
সেই পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের অভিযোগ করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে, এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে আছে। এটা দেশ এবং জনগণের জন্য উদ্বেগজনক। পুলিশ বাহিনী সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। কিন্তু সেই বাহিনীর কোনো কোনো সদস্য যদি সরকারের বিরুদ্ধে গোপনে কাজ করেন, তাহলে তা যেমন নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি; তেমনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক।
 
পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের আচরণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের অভিযোগ এসেছে। একটি থানার ওসি যেভাবে ফোনে কথা বলেছেন তাতে তাকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই মনে হয়েছে, সরকারি কর্মচারী নয়। অনেক পুলিশ সদস্য গত ১৭ বছরে সরকারি কর্মচারী না হয়ে রাজনৈতিক কর্মী হয়ে গিয়েছিলেন। তারা রাজনৈতিক ক‍্যাডারে পরিণত হয়েছিলেন। এই অবস্থার অবসান হওয়া দরকার।

সরকার পুলিশ ও প্রশাসনের এই রাজনীতিকরণ বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু উদ্যোগ আরো দ্রুত কার্যকর করা দরকার।
একটি দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। জনগণের জানমালের হেফাজত, তাদের নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই পুলিশ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। আমাদের সবারই পুলিশ বাহিনীর প্রতি নানা রকম অভিযোগ আছে। কিন্তু পুলিশ ছাড়া নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর কয়েক দিন বাংলাদেশ পুলিশ শূন্য ছিল। সেই সময় দেশে কী ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা আমরা সবাই জানি। সশস্ত্র বাহিনী তখন জনগণের নিরাপত্তার জন্য মাঠে না থাকলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতো তা কল্পনাও করা যায় না। এক সপ্তাহ পর পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে কাজে ফিরতে শুরু করে। কিন্তু অনেক পুলিশ সদস্য পালিয়ে যান, অনেকে গ্রেপ্তার হন। এসব ঘটনার প্রভাব পড়ে পুরো বাহিনীর ওপর। এই সময় পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যের মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ কাজ করছিল। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারের তখন অন্যতম দায়িত্ব ছিল পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা। তারা যেন স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করা। কিন্তু পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠনের বদলে ইউনূস সরকার মব বাহিনী গড়ে তোলে। এই মব বাহিনী ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং লুটপাট শুরু করে। 

কাজে ফেরা পুলিশ এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নিলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বাধা দেওয়া হয়। মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অনেক পুলিশ সদস্য নিগৃহীত হন, অনেকের বিরুদ্ধে সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কার্যত ইউনূস সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় মব সন্ত্রাসীরা আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তারা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। কথায় কথায় ঘেরাও, অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে মব বাহিনী দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অকেজো এবং অকার্যকর করে ফেলে। ইউনূস সরকার পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। পুলিশ মানেই দোসর, পুলিশ মানেই অপরাধী—এমন একটি মনোভাব সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সরকারের উদ্যোগে। 

ফলে পুলিশ হয়ে যায় দিকনির্দেশনাহীন। কোনটা করা উচিত আর কোনটা উচিত নয়, এই গোলকধাঁধায় বিভ্রান্ত হয়ে পুলিশ হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে। ঘেরাও কিংবা অবরোধ কর্মসূচিতে তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে। কোথাও মব হলে পুলিশ আগে ওপরের নির্দেশের অপেক্ষা করে। এভাবেই গত দেড় বছরে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি নিস্ক্রিয় হয়েছে। 

ইউনূস একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। পুলিশের কিছু সদস্য তৎকালীন সরকারের সুবিধাভোগী হতে পারে, কিন্তু সব সদস্য নয়। কিন্তু ইউনূস ঢালাও ভাবে গোটা বাহিনীকেই অপরাধী বানিয়ে ফেলে। পুলিশের একটা বড় অংশের মধ্যে তাই এই মনোভাব তৈরি হয় যে, ২৪-এর জুলাই আন্দোলন হয়েছে পুলিশের মর্যাদা ও সম্মানহানির জন্য। পুলিশ হত্যা, থানা লুটের বিচার না হওয়ায় পুলিশের একটি বড় অংশের মধ্যে হতাশা কাজ করেছে। ইউনূস সরকার পুলিশ বাহিনীকে জুলাই আন্দোলনের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। 
কয়েকজন পুলিশের অপরাধের দায় পুরো বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেন। পুলিশের মধ্যে যে জুলাই আন্দোলনবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা ইউনূসের ভুল নীতির কারণে। এর ফলে পুলিশের অনেক সদস্য এখন সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘোষণা করে পুলিশ দলীয় ক‍্যাডার হিসেবে আর কাজ করবে না। পুলিশ জনগণের সেবক হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে পুলিশের ভেতর যে অবক্ষয় হয়েছে, তা রাতারাতি শেষ হওয়ার নয়। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশের ব‍্যাপক সংস্কার করেনি। পুলিশের ভেতর যারা বিতর্কিত, দুর্নীতিগ্রস্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করেছে। সরকার আশা করেছিল, যারা এতদিন যারা চাকরির খাতিরে অন্যায় করেছে, তারা এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সঠিক পথে ফিরে আসবে। দলীয় আনুগত্যের বদলে তারা রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করবে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য সরকারের এই উদারতাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। এই জন্য সরকারকে এখন পুলিশ বাহিনীর আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এটা যত দ্রুত করা হবে, তত তাড়াতাড়ি পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে। পুলিশ বাহিনীকে যেকোনো মূল্যে রাজনীতি মুক্ত রাখতে হবে। পুলিশকে পেটোয়া বাহিনী নয়, জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে দ্রুত। তাহলেই আধুনিক এবং জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।