আজ সিলেটের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশের যে গভীর যোগাযোগ, তার শিকড় বহু বছরের পুরোনো। তখন বিমান ছিল না, ছিল না আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থাও। বিদেশে যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ ছিল সমুদ্র। ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেটের তরুণদের একটি অংশ বাণিজ্যিক জাহাজে লস্কর হিসেবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তারা পৌঁছে যেতেন ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের নানা বন্দরে। কেউ দেশে ফিরতেন, আবার কেউ জাহাজ থেকে নেমে নতুন ভূখণ্ডেই থেকে যেতেন। তাদের হাত ধরেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় এমন এক অভিবাসনধারা, যা পরবর্তী প্রজন্মে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েটসহ বিভিন্ন শহরে আজ যে বড় সিলেটি জনগোষ্ঠীর দেখা মেলে, তার পেছনে রয়েছে সেই পুরোনো সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস।
আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য জাগারনট-এর এক প্রতিবেদনে সিলেটি লস্করদের এই অভিবাসনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে আসুক আলীর গল্প। তরুণ বয়সে তিনি নাবিকের কাজ শুরু করেন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একসময় নিউইয়র্কে পৌঁছান। পরে জাহাজের চাকরি ছেড়ে লন্ডনে যান এবং শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে স্থায়ী হন। সেখানে এক আইরিশ ক্যাথলিক নারীকে বিয়ে করে সংসার গড়েন।
একজন সিলেটি তরুণের সমুদ্রযাত্রা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসতি স্থাপনের এই কাহিনি আসলে বৃহত্তর এক অভিবাসন ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। এমন অসংখ্য তরুণ সেই সময়ে সিলেটের গ্রাম থেকে বেরিয়ে অচেনা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন নতুন জীবনের আশায়।
নদীপথ থেকে সমুদ্রযাত্রা
সিলেট সমুদ্র থেকে অনেক দূরে হলেও ব্রিটিশ আমলে নদীপথ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে অঞ্চলটি বৃহত্তর নৌপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তখন কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রধান বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। সিলেট থেকে নদীপথে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত।
পণ্য পরিবহন ও নৌযানের চলাচলের কারণে স্থানীয় তরুণদের সামনে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কেউ নদীপথের নৌযানে কাজ করতেন, আবার কেউ বাষ্পচালিত জাহাজে বিভিন্ন ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হতেন। পরে তাদের একটি অংশ কলকাতা বন্দর থেকে সমুদ্রগামী জাহাজে কাজের সুযোগ পান। এভাবেই সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া একটি যাত্রা পৌঁছে যেত আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে।
লস্করদের জীবন ছিল কঠিন
জাহাজে লস্করদের কাজ ছিল শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হতো। মাসের পর মাস পরিবার থেকে দূরে থাকতে হতো। মালামাল ওঠানো-নামানো, জাহাজ পরিষ্কার রাখা, রান্না এবং পরিচালনার নানা সহায়ক কাজে তাদের যুক্ত থাকতে হতো।
এর সঙ্গে ছিল ঝড়, দুর্ঘটনা ও যুদ্ধের মতো নানা ঝুঁকি। তারপরও দরিদ্র বা সীমিত আয়ের পরিবারের তরুণদের কাছে এই পেশা ছিল বিদেশে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একটি জাহাজে কাজ পাওয়া মানেই ছিল গ্রামের পরিচিত গণ্ডির বাইরে সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে যাওয়া।
একজনের পথ ধরে অন্যজন
একজন সিলেটি বিদেশে গিয়ে কাজ পেলে তার পথ অনুসরণ করতেন আরেকজন। জাহাজে কর্মরত কেউ দেশে থাকা ভাই, আত্মীয়, বন্ধু কিংবা একই গ্রামের পরিচিত তরুণকে কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। কেউ বিদেশে থেকে গেলে নতুন আগন্তুকের থাকার জায়গাও জুটত তার মাধ্যমে।
অনেক সময় একই গ্রামের একাধিক মানুষ একই জাহাজে কাজ করতেন। বিদেশের বন্দরে পৌঁছানোর পর তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আত্মীয়তা, পরিচিতি ও একই এলাকার মানুষের ওপর নির্ভরশীল একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক।
একজনের পথ ধরে আরেকজন, তার পর আরও কয়েকজন বিদেশে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে একটি পরিবারের বিদেশযাত্রা ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামজুড়ে।
লন্ডনে তৈরি হয় সিলেটি পরিসর
সব লস্কর সমুদ্রযাত্রা শেষে দেশে ফিরে আসতেন না। কেউ জাহাজের চাকরি ছেড়ে বন্দরে অন্য কাজ নিতেন, কেউ নতুন দেশে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন। লন্ডনের বন্দরসংলগ্ন এলাকায় এভাবেই ধীরে ধীরে সিলেটি নাবিকদের ছোট ছোট বসতি গড়ে ওঠে।
আগে থেকে থাকা ব্যক্তিরা নতুনদের আশ্রয় দিতেন, কাজ খুঁজে দিতেন কিংবা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। পরিচিত মানুষের ওপর নির্ভর করে নতুন আগন্তুকও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতেন। এভাবেই লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে একটি সিলেটি সামাজিক পরিসর গড়ে উঠতে শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে খাবারের দোকান ও থাকার ঘরগুলো এই সম্প্রদায়ের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন কেউ লন্ডনে গেলে পরিচিত কোনো রেস্তোরাঁয় কাজ পেয়ে যেতেন। মালিকও অনেক সময় নিজের গ্রামের মানুষ কিংবা আত্মীয়কে সেখানে নিয়ে আসতেন।
কাজ করতে করতে নতুন অভিবাসী শহরের জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন। পরে সুযোগ পেলে নিজেই ব্যবসা শুরু করতেন এবং সেখানে আবার অন্য কাউকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতেন। ফলে একটি খাবারের দোকান শুধু ব্যবসার জায়গা ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠত কাজ, থাকার ব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র।
দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব
দুই বিশ্বযুদ্ধ সিলেটি লস্করদের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজের প্রয়োজন বেড়ে যায়। খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলও বৃদ্ধি পায়। ফলে নাবিকের চাহিদা বাড়ে।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক নাবিক নিয়োগ করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন সিলেটের তরুণরাও। তবে যুদ্ধকালীন সমুদ্রযাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শত্রুপক্ষের হামলায় বহু জাহাজ ডুবে যায় এবং অনেক নাবিক প্রাণ হারান।
যারা বেঁচে যান, তাদের কেউ দেশে ফিরে আসেন। আবার কেউ ব্রিটেনেই থেকে যান। যুদ্ধের এই সময়টিও সিলেটি অভিবাসনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুদ্ধের পর পরিবারভিত্তিক অভিবাসন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে নতুন শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে বিপুল কর্মীর প্রয়োজন ছিল।
আগে থেকে সেখানে থাকা সিলেটিরা তখন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের যাওয়ার সুযোগ করে দেন। নতুন অভিবাসীরা খাবারের দোকান, কারখানা, পরিবহনসহ নানা খাতে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে একা যাওয়ার পরিবর্তে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতাও বাড়ে।
এভাবেই লস্কর হিসেবে একা বিদেশে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে পরিবারকেন্দ্রিক অভিবাসনের ভিত্তি তৈরি করে।
সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রেও সিলেটিরা
সিলেটিদের বিদেশযাত্রা শুধু ব্রিটেনে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমুদ্রগামী জাহাজে কাজ করার সুবাদে অনেক নাবিক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছান। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল নিউইয়র্ক।
কেউ জাহাজ থেকে নেমে সেখানেই থেকে যান। পরে আত্মীয় ও পরিচিতদের মাধ্যমে নতুন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করেন। নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েটসহ বিভিন্ন শহরে ধীরে ধীরে সিলেটি বসতি গড়ে ওঠে।
ব্রিটেনের মতো সেখানেও নতুন অভিবাসীরা পরিচিতজনের সহযোগিতা পেতেন। থাকার জায়গা, কাজের সন্ধান কিংবা নতুন পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই সামাজিক যোগাযোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
অভিবাসনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়
সিলেটিদের বিদেশযাত্রার ইতিহাস নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আশফাক হোসাইনের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তার গবেষণায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময়ে সিলেটি নাবিকদের সমুদ্রযাত্রা এবং ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তার গবেষণা থেকে বোঝা যায়, এই অভিবাসনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ ছিল না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক যোগাযোগ, নদীপথ, কলকাতা বন্দর, জাহাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছিল এই পথ।
গ্রামের সম্পর্ক হয়ে ওঠে অভিবাসনের শক্তি
সিলেটি অভিবাসনের ক্ষেত্রে গ্রামের সম্পর্ক বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিদেশে যাওয়া ব্যক্তি গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন। চিঠি ও খবরের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের বিদেশের জীবন সম্পর্কে জানাতেন। পরে অর্থ পাঠাতেন দেশে।
সেই অর্থে জমি কেনা, বাড়ি তৈরি, ব্যবসা কিংবা সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটানো সম্ভব হতো। বিদেশে থাকা পরিবারের আর্থিক পরিবর্তন দেখে গ্রামের অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ বাড়তে থাকে। একসময় প্রবাসজীবন সামাজিকভাবে পরিচিত ও কাঙ্ক্ষিত একটি পথ হয়ে ওঠে।
একই গ্রামের একাধিক পরিবার বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে সিলেটের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পর্কও হয়ে ওঠে পারিবারিক। কোনো বাড়িতে বাবা-মা থাকতেন সিলেটে, সন্তান থাকতেন লন্ডনে। কোনো পরিবারের এক ভাই নিউইয়র্কে, অন্যজন দেশে। আবার কারও সন্তান জন্মেছে যুক্তরাজ্যে, অথচ তার দাদা-দাদি বা নানা-নানি রয়ে গেছেন সিলেটেই।
এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে দুই দেশের মধ্যে পারিবারিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী আয়ে বদলেছে গ্রামের চেহারা
বিদেশে থাকা সিলেটিরা দেশে অর্থ পাঠাতে শুরু করলে তার প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। প্রবাসী আয়ে গ্রামে পাকা বাড়ি তৈরি হয়েছে, জমি কেনা হয়েছে, ব্যবসা শুরু হয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনায়ও ব্যয় করেছেন অনেকে।
অনেক পরিবার দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করেছে। ধীরে ধীরে প্রবাসী আয় সিলেটের অর্থনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
প্রথম প্রজন্মের সংগ্রাম
তবে এই পরিবর্তনের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রথম প্রজন্মের অনেক লস্কর বিদেশে গিয়ে ভাষাগত সমস্যায় পড়েছেন। অপরিচিত পরিবেশে একা থাকার পাশাপাশি তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য ও কঠিন শ্রমের।
কারও বৈধ কাগজপত্রের সমস্যা ছিল, অনেকের থাকার জায়গাও ছিল সীমিত। তবু তারা টিকে ছিলেন। নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করে নতুনদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছিলেন। সেই প্রাথমিক সংগ্রামই পরবর্তী প্রজন্মের সামনে পথ খুলে দেয়।
প্রথম প্রজন্মের অধিকাংশ মানুষ শ্রমনির্ভর পেশায় যুক্ত ছিলেন। কেউ জাহাজে, কেউ খাবারের দোকানে, কেউ কারখানায়, আবার কেউ পরিবহন খাতে কাজ করেছেন। তাদের সন্তানরা তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষা গ্রহণের পর অনেকে চিকিৎসা, আইন, শিক্ষকতা, ব্যবসাসহ নানা পেশায় যুক্ত হন।
ফলে সময়ের সঙ্গে সিলেটি অভিবাসী সমাজ শুধু শ্রমনির্ভর একটি জনগোষ্ঠী থাকেনি; তা পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক ও স্থায়ী এক সামাজিক সম্প্রদায়ে।
ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে
আজ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সিলেটি। লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের মতো শহরে সিলেটি পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উপস্থিতি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েটসহ বিভিন্ন শহরে সিলেটিদের বসতি গড়ে উঠেছে। বিশ্বের আরও বহু দেশে ছড়িয়ে আছেন এই অঞ্চলের মানুষ। প্রবাসে থেকেও তাদের অনেকে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন।
অধ্যাপক আশফাক হোসাইন সিলেটিদের এই বিস্তৃত যোগাযোগকে একটি বৈশ্বিক পরিবারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ পৃথিবীর এক প্রান্তে থাকা একজন সিলেটির সঙ্গে অন্য প্রান্তের আরেকজনের সম্পর্ক অনেক সময় একই গ্রামের মানুষের মতো ঘনিষ্ঠ। একই পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন দেশে বসবাস করাও এখন অস্বাভাবিক নয়।
সমুদ্রযাত্রা থেকে বৈশ্বিক সিলেটি সমাজ
সিলেটি প্রবাসের ইতিহাস তাই কেবল বিদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমুদ্রযাত্রা, শ্রম, ঝুঁকি, পারিবারিক বন্ধন, গ্রামের সামাজিক সম্পর্ক এবং নতুন দেশে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম।
এই ইতিহাসের শুরুতে ছিলেন লস্কররা। সিলেটের গ্রাম থেকে তারা প্রথমে নদীপথে, পরে বন্দর হয়ে জাহাজে উঠেছিলেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে কেউ পৌঁছেছিলেন লন্ডনে, কেউ নিউইয়র্কে, কেউবা অন্য কোনো বন্দরে। কেউ ফিরে এসেছেন, আবার কেউ আর দেশে ফেরেননি।
যারা আর ফেরেননি, তারাই অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেছেন। তাদের পাঠানো খবর, অর্থ ও যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে আরও মানুষ বিদেশে গেছেন। একজনের বিদেশযাত্রা একসময় পরিণত হয়েছে একটি পরিবারের যাত্রায়; সেই পরিবার থেকে তৈরি হয়েছে একটি গ্রামের নতুন অভিবাসনধারা। এভাবে এক গ্রামের পর আরেক গ্রাম ধরে সিলেটি মানুষের বসতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
আজ সিলেটের কোনো গ্রাম থেকে লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে থাকা স্বজনের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা যায়। কয়েক প্রজন্ম আগে এমন যোগাযোগ ছিল প্রায় অকল্পনীয়। সেই দূরত্ব কমানোর প্রথম কাজটি করেছিলেন সমুদ্রযাত্রীরা।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে অচেনা সমুদ্র পাড়ি দেওয়া সেই তরুণেরা হয়তো জানতেন না, তাদের এই যাত্রা একদিন একটি বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় তাদের সেই পদক্ষেপই সিলেট ও বিশ্বের মধ্যে তৈরি করেছে এক স্থায়ী সেতুবন্ধন।