রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত পারমাণবিক জ্বালানি সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশে। সব প্রস্তুতি থাকলেও একটি দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না মেলায় ঘটেছে এই বিপত্তি।
পারমাণবিক জ্বালানি বহনকারী বিশেষ ওই কার্গো ফ্লাইটটির গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসে পৌঁছানোর কথা ছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়। এখন ওই দেশের আকাশসীমা এড়িয়ে ভিন্ন রুট দিয়ে আগামী মাসে এই জ্বালানি পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে রাশিয়া।
এতে করে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক আকাশপথ ও কূটনৈতিক অনুমতির বিষয়টি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, স্পর্শকাতর এই পারমাণবিক জ্বালানি উড়োজাহাজের বিশেষ কর্গোতে বহন করা হয় কঠোর নিরাপত্তা মেনে। পাশাপাশি যেসব দেশের ওপর দিয়ে চার্টার্ড বিমান আসবে, সেসব দেশের অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুমতি না পাওয়ার কারণেই নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি এসে পৌঁছায়নি।
বৃহস্পতিবার যে কার্গোটি আসার কথা ছিল, তা ঠিক কোন রুট ব্যবহারের কথা ছিল এবং কোন দেশ তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেনি আগামীর সময়। এ বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে নির্ভরযোগ্য দুটি সূত্র আগামীর সময়কে জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে এসব চার্টার্ড বিমান সাধারণত কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে। রাশিয়া থেকে উড্ডয়নের পর বিরতিহীনভাবে ভারতে পৌঁছানোর পর সেখানে যাত্রাবিরতি নিয়ে সংগ্রহ করা হয় বিমানের জ্বালানি। এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এবারও একই রুট ব্যবহারের কথা ছিল বলে আভাস মিলেছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক এক কর্মকর্তা জানালেন, রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সম্মতির পাশাপাশি যেসব দেশের ওপর দিয়ে এটি আসবে, সেসব দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি লাগে। এক্ষেত্রে ‘নিউক্লিয়ার ডিপ্লোম্যাসি’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে ওইসব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো হতে হবে। কোনো একটা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না হলে আপত্তি জানাতে পারে সেই দেশ। আবার বাংলাদেশ থেকে সম্মতিপত্র সময়মতো দেওয়া না হলেও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পেতে বিলম্ব হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে পারমাণবিক এই জ্বালানি গত জুন মাসে আসার কথা থাকলেও দুদফা সময়সীমা পিছিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত করা হয়। এজন্য রাশিয়ায় নির্ধারিত উড়োজাহাজে ওই জ্বালানি লোড করা হয়। বাংলাদেশও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ সময়ে ওইদিন রাতে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রসাটমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি পাঠাতে দেরি হবে। তবে এতে প্রকল্পের কাজে ব্যাঘাত ঘটবে না। কারণ দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ করে জ্বালানি লোড করতে এখনো বেশ সময় লাগবে।
আকাশসীমা ব্যবহার নিয়ে জটিলতার কারণে রাশিয়া এখন ভিন্ন রুট ব্যবহারে চিন্তা করছে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে চীন ও মিয়ানমার হয়ে এই জ্বালানি আসতে পারে। অথবা অন্য কোনো রুটও ব্যবহার করতে পারে রসাটম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন বেশ ঘনিষ্ঠ। আবার মিয়ানমারে পারমাণবিক অবকাঠামো নিয়ে কাজ করছে রসাটম। বাংলাদেশের সঙ্গেও চীন ও মিয়ানমারের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই পথ ব্যবহার করলে আগের জটিলতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে কোন পথ শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক ওই কর্মকর্তা বললেন, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর সেখানে উৎপাদিত পারমাণবিক বর্জ্য বা ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও এ ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এখন রাশিয়াকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিতে হচ্ছে। আর তখন নিতে হবে বাংলাদেশকে। আবার রাশিয়া কিংবা অন্য দেশ থেকে নতুন করে করে জ্বালানি আমদানিও করতে হবে ভবিষ্যতে।
তার মতে, এখন থেকেই এ ধরনের পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমঝোতা, সময়মতো অনুমতিপত্র ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা দরকার। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ শুধু কারিগরি বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিও সরাসরি যুক্ত।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী মাসে আবার জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে রসাটম। সাতটি ফ্লাইটের মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আসার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের পাশাপাশি প্রথম ইউনিটেরও কিছু জ্বালানি আসবে এই সময়ে।
যদিও প্রথম ইউনিটের জ্বালানি এরই মধ্যে লোড করা হয়েছে। কিন্তু দেড় বছর পর এই জ্বালানির এক-চতুর্থাংশ করে পরিবর্তন করতে হবে। সেজন্যই মূলত প্রথম ইউনিটের ওই জ্বালানি আগাম আনা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী প্রথম তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এরপর দুই বছর অন্তর একটা নির্দিষ্ট হারে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে এবং এই জ্বালানি তখন বাংলাদেশ আমদানি করবে।
ঝুঁকি এড়াতেই মূলত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিশেষ উড়োজাহাজে করে পারমাণবিক জ্বালানি এসে পৌঁছায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তা পৌঁছানো হয় রূপপুরে।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমান সক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। যার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং শেষে তা উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও নানান জটিলতায় সময়সীমা পেছাচ্ছে। সর্বশেষ চলতি মাসে এখান থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও সেফটি ভালভে ত্রুটির কারণে তা হয়নি। রাশিয়া থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে ত্রুটি মেরামতের কাজ করছে। এজন্য রাশিয়া থেকে কিছু যন্ত্রাংশও আনা হয়েছে। ত্রুটি মেরামত শেষে কবে নাগাদ এখানকার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ-ই।