রাজধানীর হাজারীবাগ গজমহলের সরু গলির ভেতরে পাঁচ হাজার টাকার ছোট ভাড়া ঘরে স্ত্রী আর তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে থাকতেন হামিদুল। ‘কোডা ফিল্ম কোম্পানি’র কর্মী হিসেবে মাস শেষে মিলত ১৮ হাজার টাকা। সীমিত আয় দিয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন না দেখলেও অন্তত তিনজনের পরিবারটির দুবেলা ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা ছিল।
কিন্তু এক সকালে সব থমকে গেল। কোনো নোটিস নয়, একটিমাত্র মৌখিক বাক্যে কেড়ে নেওয়া হলো হামিদুলের ৯ বছরের চাকরি। এরপর ঢাকা শহরের ইট-কাঠের নির্দয় দেয়ালগুলো নিমেষে অচেনা হয়ে উঠল। মাত্র এক মাসের মাথায় বাসা ভাড়া আর সন্তানের মুখের অন্ন জোগানোর অনিশ্চয়তা হামিদুলকে বাধ্য করল শহর ছাড়তে। ৯ বছরের শহরের জীবনকে বস্তাবন্দি করে নীরবে-নিভৃতে তিনি পাড়ি জমালেন জন্মভূমি বরিশালের গ্রামের ভিটায়। সেখানে চড়া সুদে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে এক অনিশ্চিত মুদি দোকানের স্বপ্নে বুক বাঁধছেন হামিদুল। ঢাকার কোটি মানুষের ভিড়ে হামিদুল শুধু একটি নাম নয়, তিনি দেশের অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতের কর্মীর জীবন্ত প্রতীক— যাদের ঘামে এ দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে।
হামিদুলের মতো ঝুঁকির জীবনে আছেন প্রায় সাত কোটি বেসরকারি চাকরি ও শ্রমজীবী মানুষ। যারা দিনের পর দিন শ্রমবাজারে আছেন; কিন্তু নেই সুনির্দিষ্ট নিয়োগপত্র, পেনশন বা বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি। অবসরে প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ সবকিছু নির্ভর করে মালিকের মর্জির ওপর।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শ্রম আইনের ফাঁক গলে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। উদ্দেশ্য একটাই— আইনি বাধ্যবাধকতা এড়ানো এবং যেকোনো মুহূর্তে বিনা ক্ষতিপূরণে ছাঁটাই করার পথ খোলা রাখা। এ ছাড়া মালিকপক্ষ খেয়ালখুশিমতো কর্মীকে বাদ দিলেও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার আইনি ভিত্তি থাকে না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সময় মৌখিকভাবে নির্ধারিত বেতনও ঠিক সময়ে দেওয়া হয় না। ওভারটাইমের উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে কর্মীরা বঞ্চিত হন। শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ জানাতে গেলে প্রাথমিক যে নথিপত্র প্রমাণের জন্য প্রয়োজন হয় (যেমন নিয়োগপত্র বা সার্ভিস রেকর্ড), তার অভাবে কর্মীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সাভারের আশুলিয়ার ফজলুর (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তিনি
স্থানীয় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ১৭ বছর ধরে কাজ করছেন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে জীবিকার তাগিদে চাকরিতে ঢোকেন। কিন্তু নিয়োগপত্র ছাড়াই জীবনের বড় অংশ কেটে গেছে কর্মজীবনে। বেতন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বললেন, সেটি নির্ভর করে মালিকের ইচ্ছার ওপর। অনেকে ১৫ বছর ধরে কাজ করেও পাচ্ছে না পদোন্নতি। আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুবিধা না থাকলেও স্বাস্থ্যবীমার নামে মাসের বেতন থেকে কেটে নেওয়া হয় ২০০ টাকা। সেখানে প্রায় আট হাজার কর্মীর অবস্থা একই। ফজলুর আক্ষেপ— চাকরি চলে গেলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রমাণপত্রও তার কাছে নেই। আর অবসরজীবনে যেতে হবে খালি হাতে।
সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের বৈষম্য: শ্রমবাজারে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সুযোগ-সুবিধার চিত্রটি চরম বৈষম্যমূলক। সেটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৪ থেকে ২২ লাখ সরকারি কর্মীর জন্য রয়েছে নিরাপদ ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বেসরকারি খাতের শ্রমজীবী মানুষ চাকরির নিরাপত্তাহীন অবস্থায় কাটাচ্ছে। সরকারিতে সুনির্দিষ্ট নিয়োগপত্র, গেজেট ও স্থায়ী সেবাবিধির সুব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি খাতে সিংহভাগ কর্মীর রয়েছে শুধু মৌখিক নিয়োগ; যেকোনো মুহূর্তে বিনা নোটিসে ছাঁটাইয়ের খড়্গ। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিতে নিশ্চিত পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কোনো ধরনের পেনশন নেই। আর ৯৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অস্তিত্ব নেই। শুধু তা-ই নয়, সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট পে স্কেল, নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট ও মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার বিধান থাকলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি নির্ভর করে পুরোপুির মালিক বা কর্তৃপক্ষের খেয়ালখুশির ওপর। এ ছাড়া, আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল বেশ কার্যকর। বেসরকারি খাতের জন্য কাগজ-কলমে শ্রম আইন বা বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নেই বললেই চলে।
অথচ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে স্থায়িত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মীদের মৌলিক অধিকার। উন্নত দেশগুলোতে ‘আন এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট’ বা বেকার ভাতা থাকলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেকারত্বের কোনো সামাজিক নিরাপত্তাবলয় নেই।
শ্রম আইনের প্রয়োগ ও বিশেষজ্ঞ অভিমত: বর্তমান শ্রমিকদের সুরক্ষিত ও অধিকার নিশ্চিত করতে শ্রম আইন-২০০৬, শ্রম বিধিমালা-২০১৫ এবং ইপিজেড শ্রম আইন-২০১৯ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শ্রম আইনের ধারা ২-এর দফা (৬৫) অনুযায়ী, ‘শ্রমিক’-এর ব্যাপক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী বেশিরভাগ বেসরকারি চাকরিজীবী সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু শ্রম আইন ও বিধিমালার সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এর সুফল মিলছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত মিলে মোট শ্রমজীবী কর্মী আছেন ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯ হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে সরকারি ১৪ লাখসহ প্রাতিষ্ঠানিক খােত ১ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার কর্মী রয়েছেন, যা মোট কর্মসংস্থানের ১৬ শতাংশ। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন ৮৪ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ ৫ লাখ ৮০ হাজার ২৮ জন কর্মী। যার সবাই বেসরকারি। এর মধ্যে কৃষি খাতে কাজ করছেন ৩ লাখ ৮৬ হাজার ১০০, শিল্প খাতে ১ লাখ ২০ হাজার ১০০, সেবা খাতে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩৪ জন।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাবেক বিকল্প নির্বাহী পরিচালক এবং সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, ‘বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষা দিতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের সব কর্মচারীকে সর্বজনীন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সাধারণ কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী স্কেল না থাকায় তাদের বাজারভিত্তিক এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার মধ্যে চলতে হচ্ছে।’
আইন আছে প্রয়োগ নেই: স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৭টি বেসরকারি শিল্প খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বেকারি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি শিল্পের জন্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়। গত ৭ এপ্রিল আয়রন ফাউন্ড্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ শিল্পের এবং ৯ জুন রঙ ও কেমিক্যাল কারখানার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। সিরামিকস এবং ব্যাটারি প্রস্তুতকারক শিল্প খাতের নতুন মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়া চলমান। কিন্তু অাইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছেন না অধিকাংশ খাতের কর্মীরা। সেটি উঠে আসে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গবেষণায়। সেখানে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল একটি অংশে লিখিত নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, পেইড লিভ (ছুটি) এবং আইনি সুরক্ষার মতো মৌলিক সুবিধাগুলোর বালাই নেই। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণ ও শ্রমিকদের উপযুক্ত করে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
উন্নত বিশ্বের শ্রমবাজার: উন্নত বিশ্বের শ্রমবাজারে কর্মীদের চাকরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কঠোর আইনি কাঠামো কার্যকর রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন রাষ্ট্রে মৌখিকভাবে কর্মী নিয়োগের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। কাজে যোগদানের আগেই কর্মঘণ্টা, মূল বেতন, সুনির্দিষ্ট পদবি, ছুটির নিয়ম এবং চাকরির অন্যান্য শর্তাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে লিখিত চুক্তি করা বাধ্যতামূলক।
এর বাস্তব উদাহরণ মিলছে ইতালির রোমের ‘বার অলিম্পিয়া’ প্রতিষ্ঠান। সেখানে চাকরি করছেন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রিজভী রাজ্জাক। গত বৃহস্পতিবার তিনি মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তার সঙ্গে চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত চুক্তি রয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী, সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪০-৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হয় না। এর বেশি কাজ করলে ‘ওভারটাইম’ বা অতিরিক্ত সময় হিসাবে গণ্য হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টার জন্য তাকে ৬ ইউরো অতিরিক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করা হচ্ছে। তিনি আরও বললেন, এখানে চাইলেই কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হুট করে কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারে না। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের আগে লিখিত নোটিস দেওয়া কিংবা সমপরিমাণ বেতন পরিশোধ করতে হয়। এমনকি বেআইনিভাবে ছাঁটাই করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা শ্রম আদালতে মামলা করে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি অধিকার ভোগ করেন।
উন্নত রাষ্ট্রে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা স্কিমের সুব্যবস্থা রয়েছে। যার মধ্যে পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা এবং বেকার ভাতা অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া, সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত স্বাধীন শ্রম পরিদর্শক দল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন করেন। নিয়োগপত্র, হাজিরা খাতা সংরক্ষণ কিংবা নিয়মিত মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।