ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা আপস করার দাবি নিয়ে চলছে আলোচনা। এ ঘটনায় সংশোধনাগারে থাকা কিশোরের আইনজীবী বলেন, নিহত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ টাকা এবং তার বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু বাদীর সঙ্গে এই আপস হলেই এই ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে। মামলা চলবে কীভাবে সেটিও দেখার বিষয়।
গেলো মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার ঘটনা। ঢাকার বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান মীম। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় মেহেদীকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে ঘটনার পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। মামলায় গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারক (৪৪) নামের একজনকে আসামি করা হয়।
পুলিশ বলছে, এজাহারে চালক হিসেবে আকাশ মারকের নাম থাকলেও তদন্তে পাওয়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে গাড়ির মালিকের কিশোর ছেলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি কিশোরের মায়ের নামে নিবন্ধিত বলেও জানায় তারা। ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন গাড়িচালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওই কিশোরকে আবারও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলাটি নিয়ে এক ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করা নিয়ে। সংশোধনাগারে পাঠানো কিশোরের পক্ষে জামিন আবেদন করেন অ্যাডভোকেট মো. আলমগীর হোসেন।
জামিন আবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় ওই কিশোর গাড়িচালকের পাশের আসনে বসা ছিলেন। এতে আরও দাবি করা হয়, নিহত মেহেদী শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। হর্ন দেওয়ার পরও তিনি দ্রুত সরে যেতে না পারায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
আবেদনে আরও বলা হয়, ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে কিশোরের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ৯ লাখ টাকা নগদ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসেন খোলাসা করে বলেন, নিহত মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে বিষয়টির আপস হয়েছে। দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ টাকা এবং মেহেদীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার বাদী ও নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম আপসের কথা স্বীকার করলেও টাকার অঙ্ক নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি বলেন, মামলার বিষয়ে আপস হয়েছে। কত টাকায় হয়েছে, তা তিনি জানেন না, তার মামা এ বিষয়ে জানেন।
অন্যদিকে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আরেফীন ইসলাম বলেন, আপসের বিষয়টি তার জানা নেই।
এ বিষয়ে তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, পুলিশ তাদের মতো করে তদন্ত চালিয়ে যাবে।
আইনে কী বলা আছে?
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১০৫ ধারায়। আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত বা নিহত হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধ দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে গুরুতর আহত বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে ১০৫ ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতির ঘটনা নয়। পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে সেটি রাষ্ট্রের ফৌজদারি আইনের অধীন অপরাধও হতে পারে।
১০৫ ধারার অপরাধ কি আপসযোগ্য?
বারিধারার এ ঘটনার আলোচনায় এমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১১৭ ধারায় আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা ও আপসযোগ্যতার বিধান রয়েছে। সরকারি আইন ভান্ডারের বর্তমান পাঠ অনুযায়ী, ১১৭(১)(গ)-তে ৬৬, ৭২, ৭৫, ৮৭, ৮৯ ও ৯২ ধারার অপরাধকে আপসযোগ্য বলা হয়েছে। একই আইনের ১০৫ ধারা এই তালিকায় নেই। বরং ১০৫ ধারার অপরাধকে জামিনযোগ্যতার ব্যতিক্রমের মধ্যেও রাখা হয়েছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে ১০৫ ধারার অভিযোগ থাকলে শুধু নিহতের পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার কারণে সেটিকে আইনগতভাবে আপসযোগ্য মামলা বলা যায় না।
আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, এ জায়গায় ‘পারিবারিক সমঝোতা’ এবং ‘ফৌজদারি মামলা আপস’কে আলাদা করে দেখা জরুরি। তারমতে, পরিবার কোনো অর্থ গ্রহণ করলে সেটি ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তার বিষয় হতে পারে। কিন্তু মামলার অভিযোগ যে ধারায় হয়েছে, সেই ধারাটি যদি আইনত আপসযোগ্য না হয়, তাহলে ওই অর্থ গ্রহণের কারণে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়ার কথা নয়।
৯ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি সঠিক হলে কী হবে?
বারিধারার ঘটনায় ৯ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি সত্যি হলে সেটির আইনি চরিত্র কী দাঁড়াবে? এটি হতে পারে নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা। হতে পারে দাফন-কাফনের ব্যয়। হতে পারে ভবিষ্যৎ জীবিকার জন্য সহযোগিতা। আবার পক্ষগুলো এটিকে ‘আপস’ বলেও বর্ণনা করতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষ একটি সমঝোতাকে ‘আপস’ বললেই সেটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারার অর্থে আপস হয়ে যায় না।
অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব আরও বলছেন, সমঝোতার প্রকৃতি এবং মামলার আইনি ধারা, দুটিই দেখতে হবে। কোনো লিখিত সমঝোতা থাকলে সেটিতেও কী উদ্দেশ্যে অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে কী বলা হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে অপরাধটি আইনত আপসযোগ্য না হলে ব্যক্তিগত চুক্তি দিয়ে সেই অপরাধের ফৌজদারি দায় বিলীন করার সুযোগ থাকে না।
ক্ষতিপূরণ আর শাস্তির প্রশ্ন আলাদা
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে একটি পরিবারের ওপর যে আর্থিক ক্ষতি নেমে আসে, তার প্রতিকার আর অপরাধীর শাস্তির প্রশ্ন এক নয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, একজন পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারালে তার আয় বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে চিকিৎসা, দাফন-কাফন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নির্ভরশীল বাবা-মায়ের জীবনের ওপরও প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, এই ক্ষতির আর্থিক প্রতিকার হতে পারে ক্ষতিপূরণ। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত আচরণ দায়ী কি না, এটি ফৌজদারি বিচারের প্রশ্ন। এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। পরিবারের আর্থিক ক্ষতি পূরণ করা এবং অপরাধের দায় নির্ধারণ। দুটির উদ্দেশ্য এক নয়।
আইনেও রয়েছে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-তে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আইনের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে আর্থিক সহায়তা তহবিল, সেই তহবিলে অর্থ প্রদান এবং দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহায়তার কাঠামো রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইন নিজেই দুর্ঘটনার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক প্রতিকারের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করেছে। তাই ব্যক্তিগতভাবে কোনো পরিবার অর্থ পেলেই সেটিকে ফৌজদারি মামলার আপস হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
আদালতও সব মামলায় আপস গ্রহণ করতে পারেন না
২০২৬ সালের সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধিতে আদালতের মাধ্যমে আপসের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি আইনগতভাবে আপসযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে। আইনের নতুন ৩৪৫(৮) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আপসযোগ্য মামলায় উভয়পক্ষ আপসে সম্মত হলে আদালত আপসের প্রক্রিয়া সহজ করতে পারবেন। অর্থাৎ, আদালতের এই ক্ষমতাও নির্ভর করছে অপরাধটি আগে থেকেই আপসযোগ্য কি না, তার ওপর।
ঢাকা মহানগর আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব আরও বলেন, তাই ‘আদালতে আপসের কাগজ দেওয়া হয়েছে’ এই তথ্যও একা যথেষ্ট নয়। আদালতকে প্রথমে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে আইন আপসের অনুমতি দিয়েছে কি না।
তদন্ত কি তাহলে থেমে যাবে?
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই মো. আরিফীন ইসলাম কিশোরকে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে দুর্ঘটনার পরপরই প্রাইভেটকারের ডান পাশের চালকের আসনের দরজা খুলে কিশোরকে বের হতে দেখা যায় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় ঘটনার সঙ্গে কিশোরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান থাকায় সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক রাখার আবেদন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আপসের বিষয়টি তার জানা নেই এবং পুলিশ তাদের মতো করে তদন্ত চালিয়ে যাবে।
আইনের কাঠামোতেও এর ভিত্তি রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার ও আপিলের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবে। ফলে পরিবারের সঙ্গে কোনো সমঝোতার কথা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের প্রশ্নটি থেকেই যায়। গাড়িটি কে চালাচ্ছিলেন, চালকের বয়স কত, তার বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না, গাড়ির গতি কত ছিল, চালনার ধরন বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত ছিল কি না, সিসিটিভি ফুটেজ কী বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কী, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের অংশ।
বারিধারার ঘটনায় চালক কে, সেটিও তদন্তের বিষয়
মেহেদী হাসান মীম নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রথমে আকাশ মারক নামে একজনকে গাড়ির চালক হিসেবে আসামি করে মামলা করা হয়। পরে পুলিশ দুর্ঘটনার ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে হেফাজতে নেয়। পুলিশের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর প্রাইভেটকারের চালকের আসনের দরজা দিয়ে ওই কিশোর বের হয়ে আসে এবং ফুটেজ বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। তবে এগুলো এখনো তদন্তের পর্যায়ের তথ্য। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলা যায় না।
আর কিশোরের বয়স ১৭ বছর হওয়ায় তার ক্ষেত্রে শিশু আইন ও শিশু-বিচার ব্যবস্থার বিধানও প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ একই ঘটনায় একদিকে নিহতের পরিবারের ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ফৌজদারি দায় এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের বিশেষ আইনি সুরক্ষার বিষয়।
নিহতের পরিবারের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ
তবে আপসের আইনগত সীমা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিহতের পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে অনেক পরিবার তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দাফন-কাফন, চিকিৎসা ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা সবকিছুর চাপ একসঙ্গে আসে। তাই কোনো পরিবার আর্থিক সহায়তা নিলে সেটিকে শুধু ‘মামলা মীমাংসার চেষ্টা’ হিসেবে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সেই অর্থকে ফৌজদারি অপরাধের দায় শেষ করার সমতুল্য ভাবাও আইনসম্মত নয়।
বিষয়টি নিয়ে মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের আর্থিক অধিকার এবং অভিযুক্তের ন্যায়বিচারের অধিকার, দুটিই আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচ্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে অভিযোগের সত্যতা ও অপরাধের দায় প্রমাণের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।
ক্ষতিপূরণের বড় নজির তারেক মাসুদ মামলা
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় করা ক্ষতিপূরণ মামলা। ২০১৭ সালের রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, ছেলে ও মায়ের দাবির প্রেক্ষাপটে মোট ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত রায়ে ক্ষতিপূরণের খাত হিসেবে নির্ভরশীলতার ক্ষতি, ভালোবাসা ও স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষতি, নির্ভরশীল মায়ের ক্ষতি, দাফন ব্যয়, চিকিৎসা ব্যয় এবং সম্পত্তির ক্ষতি বিবেচনা করা হয়।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি, তারেক মাসুদ মামলাটি ছিল ক্ষতিপূরণ নিয়ে এবং তখনকার মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এর অধীনে করা হয়েছিল। তাই সেটিকে বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অধীনে চলা একটি ফৌজদারি মামলার সরাসরি নজির হিসেবে দেখা যাবে না। কিন্তু দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক ক্ষতি যে আলাদা আইনি প্রতিকারের বিষয় হতে পারে, সেটি বোঝাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক উদাহরণ।