রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক দিন পর সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সেন্টারের মূল ফটকের বাইরে অস্থায়ীভাবে টেবিল-চেয়ার পেতে শুরু হয় হাম টিকাদান কর্মসূচি। এতে টিকা নিতে আসা শিশু ও তাদের মায়েদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সেন্টারের মূল ফটকের বাইরে খোলা জায়গায় কয়েকটি টেবিল ও চেয়ার রাখা হয়েছে। মাথার ওপর ত্রিপল টানিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী টিকাদানকেন্দ্র। কেউ চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছেন, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। গরমে শিশুদের অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, আজ থেকে হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সেন্টারটি ভেঙে দেওয়ায় ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল টানিয়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশপাশের লোকজনও সহযোগিতা করছেন।
নাসরিন আখতার বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক শিশু আসবে। সে জন্য ফাঁকা জায়গাতেই আমরা অস্থায়ীভাবে ব্যবস্থা করেছি। টিকাদান কার্যক্রম চলছে। তবে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা আপাতত আগের মতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
সীমিত হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা
সেন্টারটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, তাঁদের দলে চারজন চিকিৎসক এবং নার্স, প্যারামেডিকসহ প্রায় ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী আছেন। তাঁরা টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে অন্যান্য চিকিৎসাসেবা সীমিত হয়ে পড়েছে। কিছু রোগীকে শুধু প্রেসক্রিপশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে; স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে না।
সকাল থেকে ১০টির বেশি শিশু সেখানে টিকা নিতে এসেছে। দিনভর প্রায় ১০০ শিশু টিকা নিতে আসবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
মিরপুরের বাসিন্দা আফসানা আক্তার তাঁর ১৫ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, এটি তাঁর সন্তানের ১৫ মাস বয়সের শেষ টিকা। আগে সেন্টারের ভেতরে বসেই টিকা দিতে পারতেন। এবার বাইরে এসে টিকা দিতে হচ্ছে।
আফসানা আক্তার বলেন, ‘একটু অবাক হয়ে গেছি। ভাবছিলাম হয়তো ফিরে চলে যেতে হবে। কারণ, আমি রাতে ময়মনসিংহ থেকে এসেছি। আমার স্বামী সেখানে চাকরি করেন, আমরা সেখানেই থাকি। কাল রাতে ঢাকায় বাবার বাসায় এসেছি, আজ ছেলেকে এখানে টিকা দিতে নিয়ে এসেছি।’
আরেক মা আয়েশা বেগম তাঁর তিন মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, আগেরবার ঘরের ভেতরেই টিকা দিতে পেরেছিলেন। এবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
আয়েশা বলেন, ‘ভালো লাগছে না। বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বাচ্চার কষ্ট হচ্ছে। গরম লাগছে, কান্নাকাটি করছে।’

অন্য সেবাও বন্ধ
নাসরিন আখতার বলেন, যাঁরা আগে থেকে পরিস্থিতি জানেন না, তাঁরা সেবা নিতে এসে অবাক হয়ে যাচ্ছেন। কেউ টিকা দিতে, কেউ আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসছেন। কিন্তু সবকিছু ভেঙে দেওয়া ও লুট করে নিয়ে যাওয়ায় সেবা নিতে আসা লোকজনকে আশপাশের অন্য কেন্দ্রে যেতে বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ এলাকার মধ্যেই সেবা পেতে চায়। কিন্তু এখানে আমরা এখন আমাদের সাধ্যমতো শুধু টিকার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছি।’
হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে বলে অভিযোগ। পরে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নেওয়া হয়। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে। এখনো মামলার এজাহারের কপি তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন নাসরিন আখতার। তিনি বলেন, থানার পক্ষ থেকে কপিটি তাঁদের দেওয়া হবে বলে আশা করছেন।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল।