সরকার গঠনের সাত মাসের মাথায় আবারও রাজপথের কর্মসূচিতে জোর দিচ্ছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে সক্রিয় রাখার। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকানোর পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চায় বিএনপি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীসহ সারা দেশে এ লক্ষ্যে ধারাবাহিক বিক্ষোভ মিছিল করছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির নির্দেশনাও দিচ্ছেন তিনি।
দলীয় সূত্র বলছে, মাঠে ফেরার পেছনে বিএনপির মূলত তিনটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, সরকারে থাকলেও রাজপথে দলের দৃশ্যমান উপস্থিতি ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো। তৃতীয়ত, নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা। ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ২২ সেপ্টেম্বর যুবদল, ২৩ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দল ও ২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল দেশ জুড়ে বিক্ষোভ-মিছিল করেছে। আজ ২৫ সেপ্টেম্বর বিএনপি ও এই তিন অঙ্গসংগঠন যৌথভাবে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ করবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারে যাওয়ার পর দলের একটি অংশ প্রশাসনিক ও সরকারি কাজে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে মাঠের সাংগঠনিক তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়ে। এই অবস্থায় দলীয় নেতাকর্মীদের আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
বিএনপি মনে করছে, সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রচারণা ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার ঘটনা নিয়ে দলটির মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সরকার নয়; দল হিসেবেও বিএনপিকে মাঠে থাকতে হবে— এমন সিদ্ধান্ত এসেছে দলের সাম্প্রতিক যৌথসভায়। স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচি পালনের জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুরনো মাঠকর্মীরাই ভরসা
বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ আবারও সক্রিয় হয়েছেন। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের অনেকে এখন সরকার ও দলের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। আবার অনেকে এখনো কোনো দায়িত্ব পাননি। তবে সাম্প্রতিক সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দায়িত্ব না পাওয়াদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দলীয় যৌথসভা, মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুরনো আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে। দলের নেতারা এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় আছে— সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলো তারই প্রমাণ। দলের ভেতরে অবশ্য আরেকটি হিসাবও রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন সামনে রেখে পদপ্রত্যাশীরাও মাঠে নিজেদের সক্রিয়তা জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ গ্রুপভিত্তিক কর্মসূচি পালন করছেন। নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করছেন তারা।
বিএনপির তিন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন— যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও মাঠে নেমেছেন। দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করা এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা এখন আবার সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হচ্ছেন। বিএনপি মনে করছে, সামনে সংগঠন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে আন্দোলনের পুরনো কর্মীদের পাশাপাশি নতুন করে মাঠে সক্রিয় হওয়া নেতাদেরও নজরে রাখা হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাম্প্রতিক প্রায় সব কর্মসূচিতেই সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কর্মসূচিতে তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপি ক্ষমতার শক্তিতে নয়; জনগণের শক্তিতে রাজনীতি করতে চায়। ২২ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে কৃষিবিদদের কর্মসূচিতে তার নেতৃত্বে মিছিল হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশেও তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন।
রুহুল কবির রিজভী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘অনেকে হয়তো মনে করছে— রাজপথে তো বিএনপির উপস্থিতি নেই। সরকারি কর্মকাণ্ডের মধ্যে তারা ব্যস্ত। সেই উপলব্ধিটা যাতে কারও না হয়, সেজন্য বিএনপি রাজপথে রয়েছে।’
তিনি বললেন, ‘অনেক দিন ধরে দলের সাংগঠনিক তৎপরতাও কিছুটা কম ছিল। সেই তৎপরতা বৃদ্ধির জন্যও আমরা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়েছি।’
তার ভাষায়, বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাস-ট্রেনে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এই অবস্থায় জনগণের দল হিসেবে বিএনপিকে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হচ্ছে। সে কারণে সারা দেশে কর্মসূচি চলছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বললেন, বাংলাদেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে বলে দলটি মনে করছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপি মাঠে থাকবে।
তিনি বললেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নাশকতার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও জনগণের কাছে দলের অবস্থান তুলে ধরতে হবে।
প্রিন্স বললেন, ‘রাজপথ বা জনগণকে আমরা কারও কাছে ইজারা দিইনি।’ তিনি আরও জানালেন, বিএনপি জনগণের দল। তাই জনগণের সঙ্গে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অব্যাহত থাকবে চলমান কর্মসূচিও।
দেশ জুড়ে কর্মসূচি
কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজধানীর বাইরে জেলা ও মহানগর পর্যায়েও কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কর্মসূচি করছে।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি আইনজীবী সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বললেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে। তারা চায় মানুষ স্বস্তি ও নিরাপদে বসবাস করুক।
তার দাবি, সম্প্রতি কিছু পক্ষ আবারও রাজপথে সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াও করছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য সরকার ও সরকারি দলের দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণে তারা রাজপথে রয়েছেন।