Image description

দুই কিডনি অকেজো হয়ে কার্যকারিতা নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। তার আগে দীর্ঘ সময় চালাতে হবে রেনাল ডায়ালাইসিস। এর মধ্যেই শরীরে ধরা পড়ে হেপাটাইটিস-বি।

একদিকে জীবন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এসএম তাইজুল ইসলাম।

দীর্ঘ চিকিৎসা, মায়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা এবং নিজের অদম্য মনোবলে সেই কঠিন সময় পেরিয়ে ফিরেছেন তাইজুল। শুধু জীবনেই ফেরেননি, ফিরেছেন স্বপ্নের কাছেও। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

 
 

তাইজুলের বেড়ে ওঠা কোনো স্বচ্ছল পরিবারের ছায়ায় নয়। ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন বাবাকে। তখন তার বয়স মাত্র চার-পাঁচ বছর। বাবার রেখে যাওয়া কোনো সম্পদও ছিল না। অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হয়েছেন মায়ের কাছে।

 
 

পড়াশোনা করেছেন নিজ গ্রামের পাশের একটি সাধারণ দাখিল মাদ্রাসায়। মেধাবী তাইজুল পরে এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। স্বপ্নের বিষয় আইনেই পড়াশোনা শেষ করেন ভালো ফলাফল নিয়ে। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়ই হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তার দুই কিডনিই প্রায় অকার্যকর। চিকিৎসকেরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার। এর মধ্যে হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

চিকিৎসার জন্য তাকে যেতে হয় ভারতে। প্রয়োজন ছিল বিপুল অর্থের। প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই পরিবারের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু এরপরের চিকিৎসা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে পরিবারটি। বৃদ্ধা মা হাওয়া বেগমের সামনে তখন একমাত্র সন্তানের জীবন বাঁচানোর কঠিন লড়াই।

এরপর শুরু হয় তাইজুল ও তার মায়ের দীর্ঘ সংগ্রাম। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ছেলেকে নিয়ে দিন-রাত প্রার্থনা করেছেন মা। মা-ছেলের চোখের জল আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়।

তাইজুলের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা। তারা মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন করেন, লিফলেট ছাপিয়ে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এলাকাবাসী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে ফিরতে শুরু করেন তাইজুল।

তবে শারীরিকভাবে ফিরে এলেও আগের জীবনে ফেরাটা সহজ ছিল না। এরই মধ্যে তার অনেক বন্ধু ভালো চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। আর তাইজুলকে নিয়মিত চিকিৎসা, শারীরিক দুর্বলতা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবন চালাতে হয়েছে। একসময় হতাশাও গ্রাস করেছিল তাকে।

তার মা হাওয়া বেগমের একটি স্বপ্ন ছিল-ছেলেকে একদিন বিচারক হিসেবে দেখবেন। কিন্তু ভয়াবহ অসুস্থতার পর সেই স্বপ্নের পথে হাঁটার মতো শক্তি বা আত্মবিশ্বাস তখন তাইজুলের ছিল না।

তবুও থেমে থাকেননি তিনি। ধীরে ধীরে বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে শুরু করেন। চারপাশের হতাশা থেকে নিজেকে সরিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন। নিজের ভেতরের ধ্বংসস্তূপ থেকেই নতুন করে শুরু করেন লড়াই। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে থাকেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে।

অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তাইজুল।

একসময় যে তরুণের দুই কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছিল, যার জীবন বাঁচাতেই পরিবারকে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয়েছিল, সেই তাইজুলই এখন বিচারক হওয়ার পথে।

তাইজুলের এই গল্প শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এটি কঠিন অসুস্থতা, দারিদ্র্য, হতাশা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। মায়ের স্বপ্ন পূরণের গল্প। আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প।