দুর্জনেরা বলে, বেশিরভাগ বাঙালি নাকি কোনটা প্রশংসা আর কোনটা ঠাট্টা তা আলাদা করতে পারে না। এজন্যই তৈরি হয়েছে সেই প্রবাদ: ‘হুজুর কইছে শালার ভাই, আনন্দের আর সীমা নাই।’ অর্থাৎ হুজুর ‘ভাই’ ডেকেছে, এতেই আনন্দে গদগদ। সেই ‘ভাই’য়ের আগে আরও যে একটা শব্দ আছে, তাতে খেয়াল নাই। এই শব্দ যেমন খুবই কাছের আত্মীয়, তেমনি আবার বহুল প্রচলিত গালি। হুজুর সেই শব্দ কেন বলেছে তা জানার দরকার নেই, ‘ভাই’ বলেছে তো!
আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস উইং, ক্ষমতাসীন বিএনপির মিডিয়া সেল আর দলীয় মালিকানাধীন সংবাদপত্র দৈনিক দিনকালের দশাও সম্ভবত একই রকম। প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাটির মানুষ’ ও ‘সাধারণের চেয়েও পরম মহান’ বানানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে প্রেস উইং, মিডিয়া সেল আর দৈনিক দিনকাল। তবে সেটা করতে গিয়ে কখনো কখনো যে তারা প্রধানমন্ত্রীকে ‘ঠাট্টা’র পাত্র বানিয়ে ফেলছে, সেটা বোঝার মতো ‘বোধশক্তি’ তাদের নেই।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবার তার বহরে লোকজনের সংখ্যা অতীতের সরকার প্রধানদের চেয়ে কম। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় তারেক রহমানের প্রশংসা হয়েছে। আরও একটা বিষয়েও প্রশংসার দাবিদার তারেক রহমান। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের শিডিউল তছনছ করে কোনো উড়োজাহাজ অন্য রুট থেকে সরিয়ে নিউইয়র্ক নিয়ে যাননি। তিনি গেছেন তুর্কি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে, বিজনেস ক্লাসে। এতে দেশি উড়োজাহাজ নেওয়ার চেয়ে খরচ হয়েছে অনেক কম।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং কিংবা বিএনপির মিডিয়া সেলের কাছে তারেক রহমানের ভাবমূর্তি নির্মাণে এদুটি বিষয় খুব একটা পাত্তা পায়নি। তাদের দরকার ছিল ভিন্ন কিছু। আর সেটাই তারা আবিষ্কার করে ফেলেছেন তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে। সেখানে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ট্রানজিটে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ট্রানজিটের সময়ই বিজনেস ক্লাসের লাউঞ্জ থেকে খাবার নিয়েছেন তিনি।
এখনকার যুগে সবাই জানে বিজনেস ক্লাসের একজন যাত্রী সেই লাউঞ্জ থেকে বিনামূল্যে খাবার পান। আসলে এটি তার বিজনেস ক্লাসের টিকিটের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। তবে বেশিরভাগ মানুষ সেটা জানলেও সম্ভবত জানতো না প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং, বিএনপির মিডিয়া সেল আর দৈনিক দিনকাল।
দৈনিক দিনকালের ডিজিটাল সংস্করণে প্রকাশ পেল: ‘ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতিতে লাইনে দাঁড়িয়ে দরদাম করে তুলনামূলক সস্তা খাবার কিনছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।’
তারেক রহমানকে ‘সাধারণ মানুষ’ বানানোর প্রাণান্তকর চেষ্টায় এই একটি খবরে পরবর্তীতে পাঁচটি সংশোধনীও এনেছে দিনকাল ডিজিটাল। অবশ্য সবগুলোরই একই সুর: লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কিনে খেয়েছেন তারেক রহমান।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ট্রোল। কেউ হেসে বলছেন, ‘ও ভাই, বিজনেস ক্লাসের লাউঞ্জে গিয়ে খাবার আবার ক্যাশ টাকায় দরদাম করে কিনতে হয় নাকি?’ কেউবা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলছেন, ‘বিজনেস ক্লাসের লাউঞ্জে ভিড় ঠেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দরদাম? এত বড় বৈপ্লবিক আবিষ্কার!’
এভাবেই এখন ঘটনা হয়ে গেছে উল্টো। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আর দলীয় পত্রিকার ‘মহান ভাবমূর্তি’ তৈরির বদলে হাসি-ঠাট্টার পাত্র হয়ে গেছেন তারেক রহমান।
গত শতাব্দীর আশির দশকে ক্ষমতায় ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। হঠাৎ হঠাৎ দেখা যেত কোনো শুক্রবারে তিনি কোনো এক মসজিদে জুমার নামাজের সময় হাজির। আবেগ ঢেলে দিয়ে বলতেন, গত রাতে তিনি এই মসজিদে নামাজ পড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। তাই সকাল হতেই এই মসজিদে ছুটে এসেছেন।
মসজিদের মুসুল্লীরা তখন একজন আরেকজনের দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতেন। কারণ, আগের এক সপ্তাহ ধরে তারা দেখেছেন মসজিদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি আর সিআইডির লোকদের আনাগোনা। ফিসফাস করে সবাই বলেছিলেন শুক্রবার এই মসজিদে নামাজ পড়বেন রাষ্ট্রের বড় কোনো কেউকেটা।
তখন ফেসবুক-ইউটিউব-ইনস্টাগ্রামের মতো কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না। তাই সেসব মুসুল্লীর ফিসফাস তাদের মধ্যেই থেকে যেত। পরদিন দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতো রাষ্ট্রপ্রধানের স্বপ্নে দেখা মসজিদে নামাজ পড়ার কথা। অবশ্য দু’একটা বেয়াড়া সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন এরশাদের স্বপ্ন নিয়ে টিপ্পনি কাটতে ছাড়েনি।
এরশাদের এই ‘স্বপ্ন’ নিয়ে লোকজন হাসি-তামাশা করত। এক কান থেকে আরেক কান ছড়িয়ে পড়ত সেসব হাসি ঠাট্টা।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। প্রযুক্তি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, মানুষ যে কোনো জিনিস তার মোবাইল ফোনের বোতাম টিপে বের করে ফেলে। কিন্তু আধুনিক যুগের আধুনিক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং কিংবা ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মিডিয়া সেল সম্ভবত গত শতাব্দীর আশির দশকেই পড়ে আছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সাধারণ মানুষে’র ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠায় বেছে নিয়েছেন এরশাদ জমানার কৌশল।