সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বেশ কিছু চিরকুট ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওই চিরকুট কি আসলেই গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর? যদিও মরিয়মের স্বজনরা বলছেন, চিরকুটের হাতের লেখা তারা চেনেন না।
গত জুলাইয়ে ১৯ বছরের মরিয়মের সঙ্গে সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তখন মরিয়মকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করলেও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েন নজরুল। পরে ‘নৈতিক স্খলনের’ দায়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করে তার দল জামায়াতে ইসলামী। এর পর গতকাল রোববার রাতে রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরের সংসদ সদস্য ভবনের (ন্যাম ভবন) একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়।
পুলিশ পরে জানায়, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলায় সংসদ সদস্য ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। থানায় মামলাটি করেছেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ।
এদিকে, মরিয়মের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেশ কিছু ‘চিরকুটকে’ মরিয়মের বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মরিয়মের স্বজনরা ওই হাতের লেখা পড়ে তা মরিয়মের নয় বলে দাবি করেন। পুলিশও বলছে, তাদের কাছে এমন কোনো চিরকুট নেই। তাহলে ওই চিরকুট কি মরিয়মের লেখা, নাকি অন্য কারও?
হাতের লেখা চেনে না মরিয়মের স্বজনরা
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরিয়মের মা, দাদি, ফুফুর সঙ্গে কথা হয় চরচার। ওই চিরকুট নিয়ে জানতে চাইলে মরিয়মের ফুফু শামসুন্নাহার চরচাকে বলেন, ‘‘মরিয়মের হাতের লেখা এমন না।” তখন মরিয়মের মা ও দাদি কামরুন্নাহার এই কথায় সায় দেন।

মরিয়মের মা ফিরোজা খানম বলেন, “যে লেখা ছড়িয়ে পরছে, তার মধ্যে লালটা মরিয়মের হাতের লেখার কাছাকাছি; কিন্তু কালোটা না।”
মরিয়মের ফুফু বলেন, ‘‘মরিয়মের হাতের লেখা এমন না। ওর হাতের লেখা আরও খারাপ। আমরা কত বকেছি যে, তুই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিস তো হাতের লেখা খারাপ কেন?” তিনি বলেন, ‘‘এসব কিছুই সাজানো।”
মরিয়মের ফুফু শামসুন্নাহার চরচার কাছে দাবি করেন, তাকে ফোন দিয়ে এক সপ্তাহ আগে মরিয়ম বলেছিল, তাকে অত্যাচার করা হয়। গালিগালাজ ও বকাবকি করা হয়।
কে অত্যাচার করত জানতে চাইলে শামসুন্নাহার বলেন, “এমপি সাহেবের (গাজী নজরুল) কথা বলেনি। তার ওয়াইফের (প্রথম স্ত্রী) কথা বলিছে, আর হাসানের (গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত সহকারী) কথা বলিছে।” তিনি দাবি করেন, ওই বাসায় এই তিনজনই থাকত। মরিয়ম, এমপির প্রথম স্ত্রী (মাকসুদা বেগম) ও হাসান।
মরিয়মের ফুফু শামসুন্নাহার বলেন, “আমার খালাও (গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী) নিজের মুখে স্বীকার হইছে যে, হাসান গালিগালাজ করে। আমার খালা আমার মার কাছে এমন বলেছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত সহকারী মোহাম্মদ হাসানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
গাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মরিয়মের দাদা হন বলে চরচাকে জানিয়েছেন মরিয়মের দাদি কামরুন্নাহার। তিনি জানান, তার আপন বোনের স্বামী গাজী নজরুল। অর্থাৎ, গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমের বড় বোন মরিয়মের দাদি কামরুন্নাহার। সে দিক থেকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর আপন খালু গাজী নজরুল ইসলাম।
গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী হাসানের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরেই। গাজী নজরুলের বাসায় কে কে থাকত জানতে চাইলে নজরুলের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী ইস্রাফিল আলম চরচাকে বলেন, “ওই বাসায় এমপি সাহেব, মরিয়ম ও হাসান থাকত।”
মরিয়মের বাবা দুষছেন তার শ্যালক ওবায়দুরকে
আজ সোমবার সকালে সোহওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ চরচাকে বলেন, “আমার শ্যালক মো. ওবায়দুর রহমান এই হত্যার জন্য দায়ী। ওবায়দুর আমার ঘরে থেকে আমার সর্বনাশ করছে। সে ভাড়ায় গাড়ি চালাত। ওই সুবাদে এমপিকে সে আনা নেওয়া করত। পরে আমার মেয়েকে নিয়ে সে কোচিংয়ে দেওয়ার নাম করে নজরুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই বিয়ের পিছনে তার হাত আছে।”
মেয়ের সাথে সর্বশেষ কবে ফোনে কথা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মেয়েকে ফোন দিলে এমপি সাহেব রিসিভ করত। মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলে মেয়ে বলতে চাইত না।”
মরিয়মের ফুফু শামসুন্নাহার বলেন, “আমার ভাতিজির সাথে এমপির ব্যক্তিগত সহকারী হাসান দুর্ব্যবহার এবং গালমন্দ করত। এছাড়া মরিয়মের মামা ওবায়দুর মরিয়মকে একবার সাতক্ষীরা বর্ডারে পাচার করতে নিয়ে যায়। আরও আগে সে মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে ফিরে আসে। গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম গালমন্দ করত।”
মেয়ের লাশ হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়ার টাকা নেই উল্লেখ করে মাসুস বিল্লাহ চরচাকে বলেন, “আমি একজন থেকে টাকা ধার চেয়েছি, এখনো টাকা পাইনি।”
আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার দায়ে এমপি গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুরের নামে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। ওবায়দুরকে এখনো খুঁজছে পুলিশ।
গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের নামে লেখা ওই চিরকুট পুলিশ উদ্ধার করেছে কি না জানতে চাইলে শেরে বাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “আমাদের কাছে এমন কিছু নেই। তবে সিআইডির কাছে থাকতে পারে। কারণ, আমরা ওখান থেকে কোনো আলামত সরাইনি। সিআইডি ক্রাইম সিনে শেষ পর্যন্ত ছিল।”
তবে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মরিয়ম যে ঘরে থাকত, সেখান থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে।
মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী চরচাকে বলেন, “চিরকুটগুলো কে পেয়েছে, কোথা থেকে আসছে–এসব বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।”
যা লেখা আছে চিরকুটে
গতকাল রোববার রাতে মরিয়মের মৃত্যুর পর যে চিরকুট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে একটি চিরকুটে লেখা আছে, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছ, ততটা সস্তা আমি নই…।”
আরেকটিতে লেখা, “আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবই বা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছ কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’’
আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, “সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!”
আরেকটিতে লেখা আছে, “কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”
গত জুলাইয়ে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা প্রথমে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন। এরপর সংসদ সদস্য তার ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট লিখে সেখানে ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।