সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর মামলা নিষ্পত্তির কার্যক্রম গতি ফিরে পেয়েছে। এসব মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি চলছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। এজন্য প্রধান বিচারপতি গঠন করে দিয়েছেন বিশেষ বেঞ্চ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ বেঞ্চ গঠন করার পর ৬৩ কার্যদিবসে ২৬টি মামলায় ডেথ রেফারেন্স বা মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কজলিস্ট বা কার্যতালিকায় রয়েছে রাজধানীর পল্লবীর বহুল আলোচিত শিশু হত্যা মামলাটি। এমন আলোচিত ধর্ষণ-হত্যার মামলা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের নতুন ও পুরোনো ডেথ রেফারেন্স মামলা একই বেঞ্চে শুনানির জন্য রয়েছে। এগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষ বিরতিহীনভাবে শুনানি করছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল।
শুনানির জন্য প্রস্তুতিতেই লাগতো ৪-৫ বছর
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে নথিভুক্ত হওয়া মামলাগুলো শুনানির জন্য প্রস্তুত হতেই সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। এরপর নিষ্পত্তি হতে লাগে আরও কয়েক বছর। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়া মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ডেথ রেফারেন্স শাখায় পড়ে থাকে। এখন বিশেষ বেঞ্চে বিরতিহীনভাবে শুনানি ও রায় ঘোষণার ফলে দ্রুত নিষ্পত্তির পথ প্রস্তুত হয়েছে। এভাবে অন্য মামলাগুলোও দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা নিলে জট কমার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। ওই বেঞ্চে শুনানি পূর্ণ গতিতে চলছে। এরই মধ্যে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি ও রায় ঘোষণা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।’
‘তবে আমার মনে হয়, অপেক্ষমাণ ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হলে বিশেষ বেঞ্চের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শুনানি ও নিষ্পত্তির গতি আরও বাড়বে,’ যোগ করেন মোহাম্মদ আলী।
ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন বিচার বিভাগের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুল আলম উজ্জ্বল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অধিকাংশ আসামিকে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত নির্জন কনডেম সেলে থাকতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের এক ধরনের দ্বৈত সাজা ভোগ করতে হয়। ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে অন্তত দীর্ঘদিন কনডেম সেলে থাকার সেই ভোগান্তি তাদের পোহাতে হবে না। অনেক সময় অধস্তন আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতে এসে বহাল থাকে না। ফলে ডেথ রেফারেন্স মামলা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এসব মামলার দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।’
প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। ওই বেঞ্চে শুনানি পূর্ণ গতিতে চলছে। এরই মধ্যে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।- সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী
যেভাবে হয় বিশেষ বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ
রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল। ওই ঘটনার পর বিচারিক বা অধস্তন আদালতের পাশাপাশি উচ্চ আদালতেও এমন চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতিকে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
তারই ধারাবাহিকতায় বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশিদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চকে বিশেষ এখতিয়ার দেওয়া হয়। এই বেঞ্চে শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদন ও আপিলের শুনানি হচ্ছে। গত ১১ জুন বেঞ্চটিতে সংশ্লিষ্ট মামলা পাঠানো হয়। এরপর গত ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬টি মামলার শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জাগো নিউজকে বলেন, প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেওয়ার পর মামলাগুলোর শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের মুলতবি আবেদন করছে না। বিশেষ টিম করে বিরতিহীনভাবে শুনানি চালিয়ে দ্রুত এগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। এতে অনেক দিনের পুরোনো ডেথ রেফারেন্স ও আলোচিত মামলাগুলোর শুনানি দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে।
নিষ্পত্তি হওয়া কয়েকটি আলোচিত মামলা
এই বিশেষ বেঞ্চ শুনানি শেষে প্রথম রায় ঘোষণা করেন গত ১৬ জুন। ঘটনাটি ছিল যশোরের অভয়নগরের। ওই মামলায় স্ত্রী হত্যার অভিযোগে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী আব্দুল্লাহকে খালাস দেওয়া হয়।
ফেনীর বহুল আলোচিত মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয় ২৪ আগস্ট। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ১০ জন পান খালাস। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুজন হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের ও উম্মে সুলতানা ওরফে পপি। এ মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দিয়েছিলেন।
প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেওয়ার পর মামলাগুলোর শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের মুলতবি আবেদন করছে না। বিশেষ টিম করে বিরতিহীনভাবে শুনানি চালিয়ে দ্রুত এগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।- অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল
দেশের আরেক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মাগুরার শিশু হত্যা মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয় ৩১ আগস্ট। এতে প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রাখা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ মে তাকে দণ্ড দিয়েছিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
‘আরও আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা হবে’
হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মাজহারুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে ওই বেঞ্চে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকরসহ বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং নারী-শিশু হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। এখন পর্যন্ত ২৬টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করি, আরও গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত পুরোনো ও নতুন মামলার শুনানি শেষে উচ্চ আদালত রায় ঘোষণা করবেন। এতে বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগী ও আসামি—উভয় পক্ষই ন্যায়বিচার পাবেন।’
এছাড়া বর্তমানে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চের বাইরে পৃথক আরও চারটি বেঞ্চে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নথিভুক্ত ডেথ রেফারেন্স মামলার অব্যাহতভাবে শুনানি চলছে।
‘ঘৃণ্য অপরাধের বিচার দ্রুত হলে ইতিবাচক বার্তা যায়’
বিশেষ বেঞ্চ গঠন এবং ডেথ রেফারেন্স শুনানি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, বিশেষ বেঞ্চে ধর্ষণ, হত্যা ও অন্যান্য জঘন্য অপরাধের মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হয়, যা সমাজে অপরাধ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা অনেক মামলা বিচারাধীন ছিল। বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার পান, সে লক্ষ্যেই প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় ভুক্তভোগী ও আসামি—উভয় পক্ষের পরিবারই দ্রুত বিচার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা আরও জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দীর্ঘদিন কনডেম সেলে থাকতে হয়। তাদের পরিবারও চায়, মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।
বিশেষ বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলো পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে জানিয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই টিম বিরতিহীনভাবে মামলা পরিচালনা করে বেঞ্চকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে। বিশেষ টিমের এমন কার্যক্রমের সুফল হিসেবেই অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।