‘সামনে যেও না, সেখানে শামীম ওসমানের ক্যাডার বাহিনী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে’—এক সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার কথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন শহীদ বদিউজ্জামানের মামাতো ভাই ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মো. স্বাধীন মিয়া।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে স্বাধীন মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তিনি নারায়ণগঞ্জের জালকুড়িতে আন্দোলনে অংশ নেন। তার ভাষ্য, ওই দিন শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, টিটু, ভিকি, ছাত্রনেতা শুভ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। তিনি নিজেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলেন। সেখানে গুলিতে অনেক ছাত্র-জনতা আহত ও নিহত হন বলে তিনি দাবি করেন। নিহতদের মধ্যে আদিল ও ইয়াছিন ছিলেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। ঘটনাটি আনুমানিক দুপুরের দিকে ঘটে বলে জানান স্বাধীন।
স্বাধীন মিয়া আরও বলেন, ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের একটি ভবনের ছাদে একটি শিশুর লাশ পড়ে থাকার কথা তিনি শুনেছিলেন।
৪ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে জবানবন্দিতে স্বাধীন বলেন, সেদিন তিনি চাষাঢ়ায় আন্দোলনে যোগ দেন। তার দাবি, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, ভিকি, টিটু ও সাংবাদিক রাজু আহমেদসহ আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী নেতাকর্মী এবং পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় টিয়ার শেলও নিক্ষেপ করা হয় বলে তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
পরদিন ৫ আগস্ট প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে ৫ নম্বর ঘাট থেকে চাষাঢ়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা জানিয়ে স্বাধীন বলেন, পথে একজন সাংবাদিক তাদের সতর্ক করে বলেন, ‘সামনে যেও না, সেখানে শামীম ওসমানের ক্যাডার বাহিনী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে।’
তার ভাষ্য, শামীম ওসমান ও তার লোকজন চলে যাওয়ার পর তারা আবার জড়ো হয়ে চাষাঢ়ার দিকে যান। সেখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরাও জড়ো হন। মিছিল নিয়ে কালীবাজার ২ নম্বর গেটের দিকে যাওয়ার সময় পেছন থেকে শামীম ওসমানের লোকজন তার মামাতো ভাই বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায় বলে দাবি করেন স্বাধীন।
তিনি বলেন, পরে বদিউজ্জামানকে উদ্ধারের জন্য তারা এগিয়ে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়। এতে তারা পিছু হটেন। পরে লোকজন বেশি হলে তারা আবার ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত অবস্থায় বদিউজ্জামানকে উদ্ধার করেন।
জবানবন্দিতে স্বাধীন মিয়া আরও বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা তার মামাতো ভাইকে মারধর করতে দেখেন। তার দাবি, বদিউজ্জামানকে যারা মারধর করছিলেন, তাদের মধ্যে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, ভিকি, শামীম ওসমান, টিটু, সবুজ শিকদার ও চুন্নুসহ আরও অনেকে ছিলেন।
পরে আহত বদিউজ্জামানকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাধা দেওয়া হয় এবং হাসপাতালের গেটেও তাদের বাধার মুখে পড়তে হয় বলে জবানবন্দিতে দাবি করেন স্বাধীন মিয়া।
মামলায় তিন অভিযোগ
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল ও ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দমনে অস্ত্র হাতে নিয়ে হত্যাকাণ্ড চালানোর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমান জড়িত ছিলেন। ছাত্র-জনতাকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নিজেও অস্ত্র হাতে গুলি চালিয়েছেন বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
প্রসিকিউশনের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে নিজের সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে মামলার ১১ আসামিকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন শামীম ওসমান।
মামলায় শামীম ওসমান ছাড়াও তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, আসামিদের সবাই পলাতক।