Image description

একটি ব্যবসা, কিন্তু চাঁদার দাবিদার একাধিক গ্রুপ। এক পক্ষকে টাকা দিয়েও মিলছে না রেহাই। ফোন আসছে আরেক পক্ষ থেকে। দাবি করা হচ্ছে নতুন অঙ্কের টাকা। না দিলে ব্যবসা বা প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া, এমনকি গুলি করার হুমকির অভিযোগও রয়েছে। রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের এমন এক ‘চাঁদার জাঁতাকলে’ পড়ার অভিযোগ সামনে আসছে।

ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা থেকে বাসস্ট্যান্ড, রিকশার গ্যারেজ, আবাসন প্রকল্প, মার্কেট কিংবা খাবারের হোটেলসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। আগে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও এখন একই ব্যবসায়ীর কাছে একাধিক পক্ষ টাকা চাইছে বলে দাবি তাদের।

 

ফলে এক গ্রুপকে টাকা দেওয়ার পরও অন্য গ্রুপের হুমকি-ধমকির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রশ্ন, একটি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত কতটি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হবে?

সম্প্রতি চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ডেভিড ইমনের কোটি টাকা চাঁদা দাবির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠা একটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে। পরে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চট্টগ্রামের ওই ঘটনার সঙ্গে মিরপুরের পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও রাজধানীর এই এলাকাতেও চাঁদা দাবি এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নিজেদের বিরোধসংক্রান্ত একাধিক অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

‘ফোর স্টার’ থেকে ‘ফাইভ স্টার’

 

পল্লবী, মিরপুর, রূপনগর ও ভাসানটেক এলাকায় চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর অপরাধী নেটওয়ার্ক বোঝাতে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ‘ফোর স্টার’ নামটি এসেছে। তাদের সঙ্গে নতুন করে ‘ভইরা দে আশিক’ নামে পরিচিত আশিকের নাম যুক্ত হওয়ায় স্থানীয়দের একাংশ এখন এই নেটওয়ার্ককে ‘ফাইভ স্টার’ বলছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ‘ফোর স্টার’-এর এক নম্বর হিসেবে পরিচিত মফিজুর রহমান মামুনের উত্থান পল্লবী ও রূপনগরকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় শীর্ষ হিসেবে পরিচিত শাহাদাত মিরপুর ও পল্লবীর আবাসন ব্যবসা ও পরিবহন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে আধিপত্য গড়ে তোলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

তৃতীয় শীর্ষ ইব্রাহীমের উত্থান ভাসানটেক ও কালশী এলাকায় মাদক কারবার ও অবৈধ দখল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। আর মিরপুরের বিভিন্ন মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে মোক্তার হোসেন প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই চারজনকে ঘিরেই ‘ফোর স্টার’ পরিচিতি তৈরি হয়। পরে এই বলয়ের বাইরে থেকে উঠে আসে আশিকের নাম। স্থানীয়দের মতে, ছোটখাটো চাঁদাবাজির অভিযোগের মধ্য দিয়ে তার নাম সামনে এলেও বিদেশে যাওয়ার পর তিনি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, বিদেশে বসে পুরনো চাঁদার নেটওয়ার্কের ব্যবসায়ীদের নতুন করে টার্গেট করছেন আশিক। মামুন ও মশিউরকে যারা টাকা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাছ থেকেও ১৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। আশিকের বলে দাবি করা হুমকি ও গুলিসংক্রান্ত অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ‘ফোর স্টার’-এর সঙ্গে ‘ফাইভ স্টার’ কথাটিও ব্যবহার হতে শুরু করেছে।

চার দেশে চারজন, আশিক কোথায়?

গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর মিরপুর এলাকাকে চার ভাগে ভাগ করে বিদেশে অবস্থানরত চার শীর্ষ সন্ত্রাসী তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন। ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ হিসেবে পরিচিত এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন দেশে অবস্থান করে নিজ নিজ প্রভাবাধীন এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভূমি দখল ও সহিংস অপরাধে নির্দেশনা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মফিজুর রহমান মামুনের প্রভাব রয়েছে মিরপুর-১২, পল্লবী, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায়। ফ্রান্সে পলাতক ইব্রাহীমের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাসানটেক ও কালশীর নাম এসেছে।

ইতালিতে অবস্থানরত শাহাদাত হোসেন মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-৬ ও মিরপুর-৭ এবং ভারতে অবস্থানরত মোক্তার হোসেন মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে নিজ নিজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই চার ব্যক্তি মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপটেড কল, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিওআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। মাঠপর্যায়ে তাদের হয়ে অন্তত দেড় শতাধিক সক্রিয় ক্যাডার কাজ করছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আশিক বর্তমানে নেপালে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই তার অনুসারীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

মামুন: ‘ফোর স্টার’-এর এক নম্বর

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ‘ফোর স্টার’-এর এক নম্বর হিসেবে পরিচিত মফিজুর রহমান মামুন পল্লবী থানার তালিকাভুক্ত এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হত্যা, মাদক কারবার, অস্ত্র ও ডাকাতিসহ অন্তত ২৭টি মামলা রয়েছে।

মাঠপর্যায়ে তার হয়ে বড় ভাই জামিলুর রহমান ও ছোট ভাই মশিউর রহমান কাজ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ। তাদের সঙ্গে দেলোয়ার হোসেন রুবেল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, রাজন, সানি ও ‘ল্যাংড়া রুবেল’সহ আরও কয়েকজনের নামও আসে।

এক পক্ষকে টাকা দিয়েও মিলছে না রেহাই

মিরপুরের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন একই ব্যবসার ওপর একাধিক গ্রুপ চাঁদার দাবি করছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে আশিককে এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করতে শোনা যায়। ওই ব্যবসায়ী জানান, অন্য একটি গ্রুপকে তিনি ইতোমধ্যে টাকা দিয়েছেন। জবাবে আশিককে বলতে শোনা যায়, কাকে টাকা দেওয়া হয়েছে সেটি তার বিষয় নয়। তাকেও টাকা দিতে হবে, নইলে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

অডিওতে ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গুলি করার কথাও শোনা যায়। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু আবাসন প্রকল্প নয়, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, রিকশার গ্যারেজ ও হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসা থেকে একাধিক গ্রুপ চাঁদা দাবি করছে। ফলে ব্যবসা চালিয়ে যেতে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিচ্ছেন।

পল্লবীর বাসিন্দা আরাফাত বলেন, ‘পল্লবীতে গার্মেন্টস রয়েছে। চাঁদা চেয়ে না দেওয়ায় তাকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। কাফরুলে যে গুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানেও চাঁদাবাজির বিষয় রয়েছে। রূপনগরে চাঁদাবাজির ঘটনায়ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে বৃহত্তর মিরপুরে আমরা যারা সাধারণ ব্যবসায়ী, তারা একপ্রকার জিম্মি হয়ে আছি। কে কখন চাঁদা চেয়ে ফোন দেয়, তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়।’

সুজন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘পল্লবী, কালশী, বাউনিয়া বাঁধসহ এই এলাকায় মামুন ও আশিকের বাহিনীর দাপট রয়েছে। কেউ কাউকে মানে না। দুই গ্রুপের প্রায় এক হাজার অনুসারী রয়েছে। একজন এক গ্রুপকে চাঁদা দিলে অন্য গ্রুপ এসে হাজির হয়। চাঁদা না দিলে গুলি করে, চাপাতি দিয়ে কোপায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে জিম্মি। তারা থাকে দেশের বাইরে। কিন্তু এখানে এই গ্রুপগুলোর ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ আত্মগোপনে। তাদের কারণে পুরো মিরপুর অশান্ত হয়ে আছে।’

‘চাঁদাবাজদের কোনও স্থান এ শহরে হবে না’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এসব অভিযোগ ও ছড়িয়ে পড়া অডিও তাদের নজরে রয়েছে এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।

র‌্যাব-৪-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এন নিয়তি রায় বলেন, তাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সন্ত্রাসীদের অডিও কলের বিষয়েও তারা অবগত। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেও নিয়মিত অভিযান চলছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চাঁদাবাজদের কোনও স্থান এ শহরে হবে না। আমরা প্রতিনিয়ত তাদের গ্রেফতার করছি।’ তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেই আমরা জাকির নামের এক শ্যুটারকে গ্রেফতার করেছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেউ চাঁদা দাবি করলে নিকটস্থ থানা অথবা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’

তবে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটছে না। তারা বলছেন, একাধিক গ্রুপের চাঁদার দাবির কারণে শুধু আর্থিক চাপ নয়, প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও থাকতে হচ্ছে। বিদেশে বসে নির্দেশদাতা এবং দেশে তাদের হয়ে সক্রিয় সদস্যদের পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে শুধু বিচ্ছিন্ন গ্রেফতারে পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হবে কি না, সে প্রশ্নও তুলছেন তারা। একটি ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখতে তারা শেষ পর্যন্ত কত গ্রুপকে চাঁদা দেবেন?