চার দেয়ালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দও থেমে গেছে। তবু কারাগারের ভেতরে থেমে নেই হাত। শিল্পের ছোঁয়া লেগেছে বন্দীদের হাতে। কেউ সুঁই-সুতোয় কাপড়ের ওপর ফুটিয়ে তুলছেন নান্দনিক নকশা, কেউ সেলাই মেশিনে তৈরি করছেন পোশাক। কারও হাতে তৈরি হচ্ছে নকশি কাঁথা, আবার কেউ বানাচ্ছেন টি-শার্ট। দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মুক্ত জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন গাজীপুর জেলা কারাগারের বন্দীরা।
সম্প্রতি বিশেষ অনুমতি নিয়ে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করেন এই প্রতিবেদক। সরেজমিন দেখা যায়, নারী বন্দীদের ভবনের মেঝেতে বসে সারিবদ্ধভাবে কাজ চলছে। কারও হাতে সুই-সুতো, কেউ ব্যস্ত সেলাই মেশিনে। কাপড়ের ওপর একের পর এক নকশা ফুটিয়ে তুলছেন তারা। তৈরি করছেন নকশি কাঁথা ও বুটিকসের বিভিন্ন সামগ্রী।

কাজের ফাঁকে একে অন্যের সঙ্গে গল্প, হাসি-ঠাট্টাও করছেন। নারী বন্দীদের হাতে তৈরি নকশি কাঁথাগুলোতে ফুটে উঠছে নানা নকশা। নিখুঁত সেলাই ও ধৈর্যের ছোঁয়ায় সাধারণ কাপড়ও হয়ে উঠছে শিল্পকর্ম। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা শুধু একটি কাজ শিখছেন না, ভবিষ্যৎ জীবনে আয় করার একটি পথও তৈরি করছেন।
পুরুষ বন্দিদের জন্য রয়েছে পোশাক কারখানায় কাজের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। সেখানে সেলাইয়ের পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে টি-শার্টসহ বিভিন্ন পণ্য। প্রশিক্ষকরা হাতে-কলমে কাজ শেখাচ্ছেন বন্দিদের। নিজেরা সেলাই করছেন, আবার তৈরি পোশাকের মানও যাচাই করছেন তারা।
বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাগারে সময় কাটতে চায় না। তবে ভালো কাজ পেলে সময় তাদের ভালো যায়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজ শেখার সুযোগ পাওয়াটা আরও অতিরিক্ত পাওয়া। কাজ করার মাধ্যমে মুক্তির পর নিজেদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মতো কিছু থাকবে না। তাদের কাজের মান দেখে জেল কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন খুবই সন্তুষ্ট, প্রতিনিয়ত তাদের উৎসহ দেন বলে জানান তারা।

মোমেনা (ছদ্মনাম) নামে এক বন্দি এশিয়া পোস্টকে বলেন বলেন, ‘আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এসব কাজ শেখানো হয়েছে। কাজের মাধ্যমে সময়গুলো সুন্দরভাবে অতিবাহিত হয়। আগে সময় কীভাবে কাটবে, সেটাই ভাবতাম। এখন কাজ শিখছি। যে কাজ শিখছি তাতে কারাগার থেকে মুক্তির পর নিজেরাই কাজ করে খেতে পারব।
কারা সূত্র জানায়, গাজীপুর জেলা কারাগারে বর্তমানে ১ হাজার ৫০০ বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের বিভিন্ন ধরনের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কারাগারের ভেতরে করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। ‘বন্দির হাত হবে কর্মীর হাত’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিভিন্ন ইউনিট ও দলে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ।
গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, বন্দিদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নারী বন্দিদের ১৫ জন করে দল করে কাজ করানো হয়। পুরুষ বন্দিদের পোশাক কারখানায় কাজের মেশিন কিনে দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজ করে তারা নিজেরাও খুবই আনন্দিত।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, কারাগারের ভেতরে দেখলাম নারীরা বুটিকসের কাজ করছেন, নকশি কাঁথা সেলাই করছেন। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কারাগারের ভেতরে এমনটাই হওয়া উচিত। নারীরা নিখুঁতভাবে নকশি কাঁথাগুলো তৈরি করছেন, দেখতে খুবই চমৎকার।’এখানে একটি গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ ইউনিটও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বন্দিরা প্রশিক্ষণ নিয়ে টি-শার্ট তৈরি করছেন। যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এবং যারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তারা নতুন নতুন কিছু শিখছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সারা বাংলাদেশের সব কারাগারে এ ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন্দিদের দক্ষ করে তোলা উচিত। এতে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তারা সমাজে পুনর্বাসিত হতে পারবেন এবং নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। এমন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে