Image description

মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা, বাসাভাড়া বাবদই চলে যায় ১৮ হাজার। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল যোগ করলে মাসের শুরুতেই বেতনের অর্ধেকের বেশি শেষ। এরপর এক সন্তানের পড়াশোনা, নিয়মিত ওষুধ ও কাঁচাবাজারের খরচ মেটাতে গিয়ে মাস না পেরোতেই পকেট শূন্য। আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ায় বাধ্য হয়ে ভবিষ্যতের জন্য জমানো ডিপিএস ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলছেন বলেও জানান রাজধানীর বেসরকারি চাকরিজীবী ইমরান জোবায়েদ শরিফ।

জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় বাড়ায় ঢাকার লাখ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবারের দিনযাপন এখন এমনই কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে শরিফ জানান, এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া ও ইউটিলিটি বিল দেওয়ার পর যা থাকে, তা দিয়ে ভালো খাবার বা মাছ-মাংস কেনা বিলাসিতা। কম দামের সবজি কিনে কোনোমতে দিন পার করতে হয়। মায়ের ওষুধ আর সন্তানের পড়ালেখার খরচ মেটাতে গিয়ে নিজের অসুস্থতার চিকিৎসা করানোই হয় না।

তিনি আরো জানান, উপহার দেওয়ার টাকা নেই বলে আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতেও যেতে ভয় পান। সংসার চালাতে গিয়ে ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকা ঋণ হয়ে গেছে। প্রতিদিন শুধু একটাই লড়াই, পরিবারের মানুষগুলো যেন অন্তত না খেয়ে কিংবা চিকিৎসার অভাবে কষ্ট না পায়।

সংসারের প্রাথমিক খরচ সামাল দেওয়ার পর সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। সীমিত বাজেটের কারণে চিকিৎসা ও পড়াশোনার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে প্রতিনিয়ত চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান বেসরকারি চাকরিজীবী আশিকুর রহমান ইমন। তিনি বলেন, ‘আমার বেতন আর বাবার পেনশন মিলিয়ে পরিবারের মোট আয় ৪৫ হাজার টাকা। অথচ শুধু বাসাভাড়া আর গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলেই প্রতি মাসে চলে যায় ৩৪-৩৫ হাজার টাকা।’

বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিব আহমেদ বলেন, একসময় বাসাভাড়া, ইউটিলিটি বিল, বাচ্চাদের স্কুলের ফি এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসিক খরচ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে থাকত। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। আগে যে বাজার ১৫-২০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত, তা এখন বেড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। বাচ্চাদের পুষ্টির জন্য আগে নিয়মিত যেসব ফলমূল ও ভালো খাবার কেনা হতো, বাধ্য হয়ে সেসব কেনা অনেক কমিয়ে আনতে হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী আগুনের আঁচে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বড় পরিবর্তন। মাছ, মাংসের মতো প্রোটিনের প্রধান উৎসগুলো সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে প্রোটিন ও ফলমূল ছাঁটাই করে কেবল পেট ভরানোর মতো খাবার তালিকায় রাখা হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খরচ সামলাতে হিমশিম খেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানদের নামি স্কুল ছাড়িয়ে তুলনামূলক কম খরচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করছেন। বিনোদন, ছুটির দিনে বাইরে যাওয়া বা উৎসবের কেনাকাটা বহু আগেই থমকে গেছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য খাতে। রুটিন চেকআপ বা জরুরি চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সঞ্চয়শূন্য পরিবার ও লোকলজ্জার চাপ বিপদের দিনের সম্বল সঞ্চয়পত্র কিংবা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা ভেঙে সংসার চালানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। নিম্নবিত্তের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কেনা বা কারো কাছে খোলাখুলি সাহায্য চাওয়ার সুযোগও তাদের নেই। সামাজিক মর্যাদা রক্ষার এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ পরিবারগুলোয় তৈরি করছে তীব্র মানসিক অস্থিরতা।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্যসূচক ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমেছে ০.০৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে গত বছরের আগস্টে এই হার ছিল ৮.২৯ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কমেছে মাত্র ০.০৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বিবিএসের হিসাবে, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭.০২ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৭.১৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাস ও এক বছরের হিসাবে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসাই মূলত সার্বিক হার নিম্নমুখী হওয়ার প্রধান কারণ।

তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় মূল্যচাপ বেড়েছে। আগস্টে এই খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৯.২৮ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে এই হার ছিল ৮.৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরো বেড়েছে।

এদিকে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বাড়ছে কম হারে। আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি হার সূচকের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.০৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮.২২ শতাংশ এবং গত বছরের আগস্টে ছিল ৮.১৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে ০.১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।

খাতভেদে আগস্টে কৃষিতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৭ শতাংশ, শিল্পে ৭.৯৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮.২৫ শতাংশ। ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার ০.২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গতি কমায় আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে বাড়তি চাপ এবং মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো চাপে রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে

পরিসংখ্যানে যাই থাকুক, বাজারে গিয়ে প্রতিফলন পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে বলেন, মূলত মূল্যস্ফীতির কারণেই দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। ২০২২ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ যখন সামষ্টিক অর্থনীতির সংকটে পড়ে, তখন থেকেই মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের শুরুতে এটি কিছুটা কমলেও মাঝামাঝি সময় থেকে আবার বেড়ে যায়। গত তিন মাসে সামান্য কিছু কমলেও মূল্যস্ফীতি এখনো অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে বিরাজ করছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং ভোগ ও চাহিদা কমে গেছে।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান তিনটি কারণ উল্লেখ করে তিনি জানান, সাপ্লাই চেইন ও মূল্যের কারসাজির মতো বাজারের ম্যানিপুলেশন, ডলার সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং আমদানিতে বিধিনিষেধ থাকায় বাজারে সামগ্রিক সরবরাহ কমে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল এবং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও সুসংগঠিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। এটি বহু পুরোনো সমস্যা। এর ফলে সিন্ডিকেট কিংবা সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তর থেকে শুরু করে একদম খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত ব্যাপকভাবে মূল্যের কারসাজি করা হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, যাদের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বা সিন্ডিকেট রয়েছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের কেবল হাতবদল হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেবল এক হাত থেকে অন্য হাতে গেছে। তাদের মানসিকতা দাঁড়িয়েছে এমনÑ‘আমরা এতদিন বাইরে ছিলাম, এখন আমাদের করার পালা’। ফলে এই পালাবদলের পুরো বোঝাটাই এখন বাজারের ওপর এসে পড়ছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এর পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও দক্ষতা বহুগুণ বাড়াতে হবে।