Image description
উজানের ঢল পদ্মায়

কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে দৌলতপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৮০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। তলিয়ে গেছে ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি। বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় গবাদিপশু, গোখাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। পানি বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই দুই ইউনিয়নের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলা ও শিবগঞ্জের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ করা হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ-

কুষ্টিয়া ও দৌলতপুর : পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হলেও শুক্রবার বেলা ৩টায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ০২ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। পানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৌলতপুরের ভাগজত পয়েন্টেও পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। পাউবো সূত্র বলছে, এ পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। ফলে এ পয়েন্টেও বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে নদীর পানি। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মানুষ।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও কোমর বা হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। নৌকা হয়ে উঠেছে দুর্গত মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে।

শুধু বন্যা নয়, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বসতবাড়ির আশপাশে পানি উঠে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

চিলমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের সংকট তীব্র হবে। বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের জন্য দ্রুত সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।

দৌলতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।

দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, আগামী দু-একদিনের মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দৌলতপুরের ইউএনও অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দিদের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : পদ্মার পানি বাড়ায় সদর উপজেলা, শিবগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এ জেলায় পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে ওই অঞ্চলের আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৫৬ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় তীব্র বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও চিকিৎসার সংকট দেখা দিয়েছে। ?চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব জানিয়েছেন, বন্যা পূর্বাভাসের তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার পর্যন্ত পানি বেড়ে কমতে শুরু করবে।