নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পেশ করা হচ্ছে। এটি হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম কোনো রেলপথ বিদ্যুতায়ন প্রকল্প।
একনেক সূত্রে জানা গেছে, একই সভায় অনুমোদনের জন্য ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট প্রকল্পটিও পেশ করা হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় একনেক সভা আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে মোট ১৫টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। এ ছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রীর অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ১৫টি প্রকল্প অবহিতকরণের জন্য সভায় উপস্থাপন করা হবে।
‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ওভারহেড ক্যাটেনারি ও ট্রাকশন সাব-স্টেশন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বাকি ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ হিসেবে সংস্থান করা হবে। এতে ঋণ প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথ বরাবর ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম স্থাপন, ১৬টি ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ এবং ইএমইউ রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ইএমইউ সেটে পাঁচটি করে কোচ থাকবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনটি দেশের অন্যতম ব্যস্ততম রেলওয়ে করিডোর, যেখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় ট্রেন বা কোচের অভাবে রেলওয়ে ক্রমবর্ধমান যাত্রাহিদা মেটাতে পারছে না।
বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবস্থা চালু হলে পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্রেনের গতি বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় হ্রাস, রাজস্ব বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে রেলওয়ে।
প্রকল্পের নথি অনুসারে, বর্তমান ডিজেল-ইলেকট্রিক ব্যবস্থার তুলনায় এই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি দক্ষ। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক কোচের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও ডিজেল-ইলেকট্রিক ব্যবস্থার চেয়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম হবে।
তাছাড়া বৈদ্যুতিক ট্রেনের দ্রুত গতি বাড়ানো এবং কমানোর (অ্যাক্সিলারেশন ও ডিসিলারেশন) চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে, যা দ্রুত গতি পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। ফলে এর গড় গতি প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সীমিত সংখ্যক ডিজেল লোকোমোটিভের উপর নির্ভরতা কমবে এবং বিদ্যমান রেল ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি এটি যাত্রী পরিবহনে রেলের অংশীদারত্ব বাড়াবে এবং সড়কের ওপর চাপ কমাবে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটিকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা যাত্রার সময় ও ব্যয় কমাবে এবং যাত্রী ধারণক্ষমতা ও রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে।
অনুমোদনের অপেক্ষায় এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট
একই সঙ্গে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট প্রকল্পটিও অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় পেশ করা হবে। এডিবি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে নির্মাণ হতে যাওয়া এই প্রকল্পটিই হবে বিএনপি সরকারের অনুমোদিত প্রথম এমআরটি প্রকল্প।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে, যার মধ্যে ১১টি ভূগর্ভস্থ (পাতাল) এবং ৪টি উড়াল (মাটির উপরে) স্টেশন।
গাবতলী-আফতাবনগর অংশটি মাটির নীচ দিয়ে এবং আফতাবনগর-দাশেরকান্দি অংশটি উড়ালপথে নির্মিত হবে। রুটটি মিরপুর টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও এবং আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি গিয়ে শেষ হবে।
প্রকল্পটির অধীনে শুরুতে ৬টি এয়ার-কন্ডিশনড কোচ বিশিষ্ট ১৯টি ট্রেন পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী বহন করতে পারবে।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দির ভ্রমণ সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট, যেখানে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পর পর ট্রেন চলাচল করবে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশন এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মধ্যে আলোচনার পর ব্যয় সংশোধন করে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এডিবি প্রকল্পটিতে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত এবং দক্ষিণ কোরিয়া দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।
একনেক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য প্রকল্প
একনেক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের অধীনে জেলা মহাসড়ক উন্নীতকরণ, বরিশাল সেনানিবাস নির্মাণ, খুলনা নৌ অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, খুলনার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েল-গেজ রেলপথ নির্মাণ, তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতে শ্রম কল্যাণ উন্নয়ন এবং মনপুরায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
তালিকায় আরও রয়েছে মা, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প; যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া দূরীকরণ কর্মসূচি; ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২; ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকায় বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করার প্রকল্প।