Image description

ধান, গম ও ভুট্টার উৎপাদন বাড়ছে। সরকার বলছে, তাদের গুদামেও রয়েছে বিপুল খাদ্যশস্য। তারপরও দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ চলতি মাস থেকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

এখানে সংকটটা খাবারের অভাবে নয়, বরং খাবার কেনার সামর্থ্যে। এফএও বলছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পাতে তা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও খাদ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এফএওর গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ইনফরমেশন অ্যান্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (জিআইইডব্লিউএস) ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্রিফে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) ফেজ-৩ বা তার বেশি মাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। গত মে থেকে আগস্ট সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানেই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।

অথচ একই সময়ে দেশের খাদ্য উৎপাদনের চিত্র মোটেও খারাপ নয়। এফএওর হিসাবে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে দেশে মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় উৎপাদনের চেয়ে অন্তত ৫ শতাংশ বেশি। গত জুনে শেষ হয়েছে সেচনির্ভর বোরো মৌসুম। এবার বোরো উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন এবং আউশের উৎপাদন প্রায় ৪১ লাখ টন। মাঠে থাকা আমন ধানের উৎপাদনও ২ কোটি ৫৯ লাখ টন হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ভুট্টা ও গমের উৎপাদনেও রয়েছে ইতিবাচক চিত্র। এফএওর হিসাবে, গত জুলাইয়ে ভুট্টার মৌসুম শেষে দেখা গেছে, উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ টন, যা গত পাঁচ বছরের গড় উৎপাদনের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এ ছাড়া গত এপ্রিলে মৌসুম শেষে দেখা গেছে, গম উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড প্রায় ১২ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবেও ভুট্টা ও গমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।

 

সরকারের খাদ্য মজুদের চিত্রও আশ্বস্ত করার মতো। খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম গত ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে জানিয়েছিলেন, ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি খাদ্যগুদামে ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৭ টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল, যা নির্ধারিত নিরাপত্তা মজুদের চেয়েও বেশি।

তাহলে সমস্যা কোথায়? খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ গোলাম রসূলের ভাষায়, গুদামে খাদ্য থাকা আর মানুষের চুলায় সেই খাবার পৌঁছানো এক কথা নয়। খাবার কিনতে মানুষের হাতে টাকা থাকতে হবে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষের সেই ক্রয়ক্ষমতাই কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মজুরি বাড়ছে না, কোথাও আবার কাজ বা চাকরি হারানোর কারণে আয়ও কমছে।

অন্যদিকে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও আমদানির প্রয়োজন কমছে না, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বাড়ছে। এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য আমদানি হতে পারে প্রায় ৯১ লাখ টন, যা ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ (গড়) চেয়ে কিছুটা বেশি। এর মধ্যে গম আমদানি হতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ টন, যা সাম্প্রতিক পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। পশুখাদ্য ও মৎস্য খাতের চাহিদা বাড়ায় ভুট্টা আমদানিও প্রায় ১৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে, যা গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। তবে চাল আমদানি কমে হতে পারে ৮ লাখ টন, যা গত বছর হয়েছিল ১৯ লাখ টন।

এফএও বলছে, দেশে আমদানিকরা দানাশস্যের অধিকাংশ গম, যা দেশের দানাশস্যের ভোগের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে। এর পাশাপাশি স্বল্প পরিমাণে চাল ও ভুট্টা আমদানি করা হয়। অর্থাৎ দেশের কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও মানুষের খাদ্যচাহিদা, পশুখাদ্য ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতাও থাকছে।

তবে বাজারে চাল ও আটার দাম নিয়ে আপাতত কিছুটা স্বস্তির খবরও আছে। এফএওর হিসাবে, পর্যাপ্ত নতুন ধান বাজারে আসায় জুলাইয়ে চালের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম ছিল। আটার দাম বছরের শুরুতে বাড়লেও জুলাইয়ে তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম ছিল।

তারপরও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি কাটছে না। বিশেষ করে কক্সবাজার ও ভাসানচরে থাকা প্রায় ১২ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খাদ্য সহায়তায় অর্থের ঘাটতি ও সীমিত জীবিকার সুযোগের কারণে তাদের একটি বড় অংশ সংকট বা জরুরি পর্যায়ের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে এফএও।

এর সঙ্গে সামনে আসছে আরেকটি বড় শঙ্কা— জ্বালানি ও সারের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট আরও বাড়লে কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। বিশেষ করে আগামী বোরো মৌসুমে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

ড. গোলাম রসূল বলছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের আরও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। আবার সারের দামও বাড়ছে। ফলে আগামী বোরো মৌসুম কৃষকদের জন্য চ্যালেঞ্জের হতে পারে। কারণ কৃষি আর আগের মতো নেই, জ্বালানিনির্ভর হয়ে গেছে। এজন্য খাদ্য মানেই কৃষি মন্ত্রণালয়, এই চিন্তা থেকে সরকারকে বের হয়ে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাই বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন, শুধু কত টন ধান, গম বা ভুট্টা উৎপাদন হলো, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, সেই খাদ্যশস্য কতটা মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা যাচ্ছে এবং আয় কমে যাওয়া পরিবারগুলোর খাবার কেনার সক্ষমতা কীভাবে ধরে রাখা যায়।