সরকারি চাকরির নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এবং দ্রুত নিয়োগে কমিটি গঠনে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থী, সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
সমালোচকরা বলছেন, মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানো এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অধীনে থাকা ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা’ পদের নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন বিএনপির নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিলছে না। অথচ দলটি নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল ভিত্তি এবং প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত। দলটি ক্ষমতায় আসার প্রায় সাত মাস পর এই বিতর্ক তৈরি হলো।
সরকার ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরির নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, ১১তম ও ১২তম গ্রেডের পদের জন্য লিখিত পরীক্ষায় ১০০ এবং ভাইভায় ৫০ নম্বর রাখা হয়েছে। ১৩তম থেকে ১৬তম গ্রেডের পদের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা ৬০ এবং ভাইভা ৪০ নম্বরের হবে। আর ১৭তম থেকে ২০তম গ্রেডের পদের জন্য লিখিত ও ভাইভা—উভয় পরীক্ষাতেই ২৫ করে নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে।
সরকারের এই পদক্ষেপ ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া একটি বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন তিনি ভাইভায় ২০০ নম্বর বরাদ্দ রাখার সাবেক ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেছিলেন।
তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতির মূল সুযোগ তৈরি হয়েছিল কারণ ভাইভাতে ২০০ নম্বর ছিল। সেটা কমিয়ে ৫০ বা ১০০ করা হলে এ ধরনের দুর্নীতির সুযোগ আর থাকবে না।’
তবে প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এই পরিবর্তনের পক্ষেই যুক্তি দিয়েছেন। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘ভাইভা কি পরীক্ষা নয়?’
ভাইভা পরীক্ষায় পক্ষপাতিত্ব বা কারও প্রতি ঝুঁকে পড়ার সুযোগ থাকে—তা স্বীকার করে নিজের চিকিৎসা শিক্ষার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তারি পড়েছি। সেখানে আমাকে লিখিত পরীক্ষার চেয়ে দ্বিগুণ নম্বরের ভাইভা পরীক্ষা দিতে হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের রাজপথে আন্দোলন
খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা, বরিশাল ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে নতুন নিয়মের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন।
তাদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ালে ব্যক্তিপছন্দ, স্বজনপ্রীতি, সুপারিশ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ আরও বেড়ে যাবে।
তবে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, কাউকেই বাড়তি সুযোগ বা বৈষম্য করতে নয়, বরং একটি দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা’, ‘কোটার বিরুদ্ধে ভাইভা, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘মামা-ভাগ্নের সুপারিশ চলবে না’ এবং ‘ভাইভার নামে রাজনীতিকীকরণ বন্ধ করো’—ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ছাত্র রায়হান হাসান রাব্বি টাইমসকে বলেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভার সময়েই অনিয়মের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সরকারের এই উদ্যোগকে ‘কোটার নতুন রূপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আরিফ সোহেল বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়বে। ফলে প্রকৃত মেধা তালিকার যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান জানান, শিক্ষার্থীদের এই ভয় একেবারেই অমূলক নয়।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘ভাইভার নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই সঠিক ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি মানা হয় না। অনেক সময় বিশেষ কাউকে সুবিধা দেওয়া হয়, আবার কাউকে বঞ্চিত করা হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ভাইভা পরীক্ষায় সহজেই কারচুপি করা সম্ভব।’
বিএনপির মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ইশতেহারে বলা হয়েছিল, নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। সততা, মেধা, দক্ষতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রশাসন, পুলিশসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা হবে।
তাদের ‘মেধাবীদের বাংলাদেশ’ গড়ার মূল প্রতিশ্রুতিই ছিল—নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের একমাত্র মানদণ্ড হবে মেধা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।
এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের মতো জায়গায় স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে পিএসসি’কে শক্তিশালী ও নতুন করে সাজানোর কথাও বলা হয়েছিল।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি নেতা তারেক রহমান অভিযোগ করেছিলেন, আগের সরকার সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির পুরো ব্যবস্থাটিকেই রাজনীতিকীকরণ করেছিল।
তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে বিএনপি সমর্থক কিংবা সাধারণ মানুষ, যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তারা চাকরি পাননি অথবা চাকরি হারিয়েছেন।
তবে ক্ষমতায় আসার পর সরকারি বিভিন্ন বোর্ড, কর্পোরেশন ও সংস্থার শীর্ষ পদগুলোতে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টারের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এটি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে, দুর্নীতি বাড়াবে, সুশাসন ব্যাহত করবে এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতি করবে। এই ধরণের নিয়ম নিয়োগ ব্যবস্থায় চরম অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা ডেকে আনবে।’
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগের পুরো বিষয়টি বোর্ডের সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি যুক্তি দেন, ‘যেহেতু ভাইভার কোনো লিখিত প্রমাণ বা রেকর্ড থাকে না, তাই লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীকেও ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া সম্ভব। আবার লিখিত পরীক্ষায় খুব ভালো করা প্রার্থীকেও ভাইভায় কম নম্বর দিয়ে বাদ দেওয়া যাবে।’
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকও মনে করেন, ‘প্রস্তাবিত নিয়মটি কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়। এতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য ব্যক্তিরা প্রশাসনে ঢুকে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।’
অবশ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান দাবি করেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে বের করে নিয়োগের মান উন্নত করা।
এদিকে, ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা’ পদে দ্রুত নিয়োগের সুবিধার্থে সরকার চার সদস্যের একটি নতুন কমিটি করেছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারীকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবকে।
অথচ আগে এই পদের পরীক্ষা গ্রহণ ও নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্ব একচেটিয়াভাবে পিএসসির হাতেই ছিল।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোট ১৪ হাজার ১০০টি পদের মধ্যে খালি থাকা ৩ হাজার ৭৫১টি পদে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগের জন্য আগে আবেদন জানিয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন এই কমিটি নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে এবং চাইলে নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারবে।
তবে পিএসসির মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এই কমিটি ঠিক কিভাবে ত্বরান্বিত করবে, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর পর এই কমিটি গঠন প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও পিএসসির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়াদুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘একটি কারণ হতে পারে যে পিএসসির দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। তবে এই নতুন ব্যবস্থার কারণে পুরো নিয়োগে মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাবে। মূল দুশ্চিন্তা হলো—এই নিয়োগ আদৌ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকবে তো?’