Image description

নিজ বাসায় দুই মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় সরকারের সংশ্লিষ্টদের গালিগালাজ করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীকে আটক করে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) গাছা থানা পুলিশ। তবে তাকে আটকের কারণ, কোন আইনে মামলা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে—এসব বিষয়ে গাছা থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যে একাধিকবার পরিবর্তন আসায় নতুন করে আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকার বাসা থেকে সিফাত আব্দুল্লাহকে আটক করে পুলিশ। জানা গেছে,  তিনি রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং পরে পুলিশ তাকে আটক করে।

সিফাতকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে গাছা থানায় এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এনসিপির নেতাকর্মীরা সিফাতের মুক্তির দাবি জানালেও বিএনপির নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। এ সময় থানার ভেতরে ও বাইরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে ।

সিফাত আব্দুল্লাহকে আটকের পর বৃহস্পতিবার রাতে গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম রব্বানী গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি ও অশালীন ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। ওই সময় তিনি আরও জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে তথ্য আইসিটি আইন লঙ্ঘন করার মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই অভিযোগে নতুন কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। ফলে কটূক্তির অভিযোগে আটকের পর আইসিটি আইনের মামলার সম্ভাবনার কথা কেন বলা হয়েছিল, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

একই ঘটনার বিষয়ে আজ শুক্রবার দুপুরে পুলিশের বক্তব্যে আরও পরিবর্তন আসে। গাছা থানার ওসির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের জানানো হয়, সিফাত আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণেও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে পুরানো মামলায় আদালতে পাঠানো হয়ে।

কিন্তু আটকের শুরুতে যে অভিযোগে তাকে থানায় নেওয়া হয়েছিল—অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন ভাষায় বক্তব্য—সেখান থেকে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ সামনে আসায় গ্রেপ্তারের প্রকৃত কারণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সিফাত আব্দুল্লাহকে নতুন কোনো আইসিটি বা কটূক্তির মামলায় নয়, একটি পূর্বের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রথমে কটূক্তির অভিযোগে আটক, পরে নতুন মামলা প্রক্রিয়াধীন থাকার কথা এবং সবশেষে পূর্বের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার—একই ঘটনায় পুলিশের ব্যাখ্যায় একাধিক পরিবর্তন দেখা গেছে।

ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিফাত আব্দুল্লাহকে আটকের বিষয়ে মূলত তিন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তি ও অশালীন ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলার কথা। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ এবং সবশেষে পূর্বের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার।

একই ব্যক্তিকে আটকের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গ্রেপ্তারের কারণ ও মামলার বিষয়ে এমন ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গন ও স্থানীয় জনমনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

এনসিপির নেতাকর্মীরা ঘটনাটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের অভিযোগের বিচার দাবি করেছেন।

তবে গ্রেপ্তারের কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের পরিবর্তনই এখন ঘটনাটির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রথমে যে ভিডিও ও বক্তব্যকে আটকের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাকে কেন পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো—সে প্রশ্নের স্পষ্ট ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে সিফাত আব্দুল্লাহকে আটকের প্রকৃত প্রেক্ষাপট, নতুন কোনো মামলা দায়ের হয়েছে কি না এবং পূর্বের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্তের কারণ—এসব বিষয় নিয়ে এলাকায় ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।