নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারী চালক ও কন্ডাক্টরদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ১৮ আগস্ট রাজধানীতে ‘পিংক বাস’ সেবা চালু করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। ঢাকায় প্রাথমিকভাবে ৯টি রুটে ১০টি বাস দিয়ে এ সেবা শুরু হয়। এসব বাসের চালক ও কন্ডাক্টর নারী। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও আরও চারটি বাস চালু করা হয়েছে।
সেবা চালুর পরদিন ১৯ আগস্ট একটি দোতলা পিংক বাসের চালকের আসন থেকে এক নারী চালকের উঠে যাওয়া এবং তার জায়গায় পুরুষ চালকের বসার একটি ভিডিও ক্লিপ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওইসব সংবাদমাধ্যম দৃশ্যটিকে ‘‘ফ্লাইওভারে বাস ওঠাতে নারী চালকের ব্যর্থতার ফলে পুরুষ চালকের সহায়তার দৃশ্য’ বলে তুলে ধরে।
মোট ১৮টি সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি একই বা কাছাকাছি শিরোনামে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শিরোনামগুলোর মধ্যে দেশ রূপান্তর লিখেছে, “ফ্লাইওভারে উঠাতে ব্যর্থ পিংক বাসচালক, সহায়তায় পুরুষ ড্রাইভার”।
দীপ্ত টিভি লিখেছে, “ফ্লাইওভারে ‘পিংক বাস’ তুলতে ব্যর্থ নারী চালক, সহায়তায় পুরুষ চালক”।
দ্য ঢাকা ডায়েরি লিখেছে, “ফ্লাইওভারে উঠতে বেকায়দায় ‘পিংক বাস’, সহায়তা করলেন পুরুষ চালক”।
একই ধরনের শিরোনাম করেছে কালবেলা, আরটিভি, এনপিবি নিউজ, স্টারনিউজ ও আমার সংবাদও।
এশিয়া পোস্ট ও দেশ টিভি শিরোনামে নারী চালকের ব্যর্থতার বদলে বাস থেমে যাওয়া এবং সহকর্মীর সহায়তায় সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে।
বাংলাদেশ টাইমসও ব্যর্থতার সঙ্গে পুরুষ চালকের সহায়তার বিষয়টি শিরোনামে উল্লেখ করেছে।
টাইমস টুডে লিখেছে, “ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে ব্যর্থ নারী চালক, সহায়তা নিলেন পুরুষ চালকের”।
ভিডিও কনটেন্টের ক্ষেত্রে ইত্তেফাক ক্যাপশন দিয়েছে, “ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে ব্য'র্থ নারী চালক, নিতে হলো পুরুষ চালকের সাহায্য”। একই শিরোনাম ব্যবহার করেছে যুগান্তর, নয়াদিগন্ত ও 2জাগোনিউজ। ডেইলি বাংলাদেশও “ফ্লাইওভারে পিংক বাস উঠাতে ব্যর্থ নারী চালক, নিলেন পুরুষ চালকের সাহায্য” শিরোনাম দিয়েছে। আজকের পত্রিকা লিখেছে, “ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে গিয়ে বিপাকে নারী চালক, এগিয়ে এলেন পুরুষ চালক”।
১২টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ফ্লাইওভারে ওঠার সময় নারী চালক ফাহিমা সানজান ‘পিংক বাস’টি তুলতে ব্যর্থ হন বা বিপাকে পড়েন। পরে একজন পুরুষ চালক এগিয়ে এসে বাসটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটি ফ্লাইওভারে তুলে দেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে এ সময় নারী যাত্রীদের উৎকণ্ঠা এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা বা যানজট এড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ফ্লাইওভারে বাস ওঠাতে নারী চালক ব্যর্থ’ হওয়ার গল্পটি ভুয়া
উপরিউক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফ্লাইওভারে বাস ওঠাতে ব্যর্থ হওয়ার গল্প প্রচার করা হয়েছে।
যেমন, বাংলাদেশ টাইমস লিখেছে, “শাহজাহানপুরে ফ্লাইওভারে ওঠার সময় দোতলা বাসটি ঢাল বেয়ে ওপরে তুলতে ব্যর্থ হন নারী চালক। পরে তিনি বাসটি থামিয়ে দেন। এ সময় সড়কে বড় ধরনের যানজট বা কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তায় এগিয়ে আসেন একজন পুরুষ চালক।”
দেশটিভি লিখেছে, “রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এসময় দোতলা বাসটি নিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠার সময় বিপত্তিতে পড়েন চালক ফাহিমা সানজান। ফ্লাইওভারের ঢাল বেয়ে বাসটি ওপরে তুলতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বাসটি থামিয়ে দেন।”
স্টার নিউজ লিখেছে, “শাহজাহানপুরে ফ্লাইওভারে ওঠার সময় দোতলা বাসটি ঢাল বেয়ে ওপরে তুলতে ব্যর্থ হন নারী চালক। পরে তিনি বাসটি থামিয়ে দেন। এ সময় সড়কে বড় ধরনের যানজট বা কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তায় এগিয়ে আসেন একজন পুরুষ চালক।”
এনপিবি লিখেছে, “ফ্লাইওভারে ওঠার সময় কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়েন বাসটির চালক ফাহিমা সানজান। ফ্লাইওভারের ঢাল বেয়ে দোতলা বাসটি ওপরে তুলতে ব্যর্থ হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বাসটি থামিয়ে দেন।”
কালবেলা লিখেছে, “পিংক বাসের চালক ফাহিমা সানজান ফ্লাইওভারে ওঠার সময় বাসটি ঢাল বেয়ে ওপরে তুলতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি বাসটি থামিয়ে দেন। এ সময় বাসে থাকা নারী যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।”
তবে দ্য ডিসেন্ট এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ব্যর্থতার গল্পটি বানোয়াট।
প্রথমত, দ্য ডিসেন্ট ভিডিওতে দৃশ্যমান জায়গাটি জিওলোকেট করেছে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ২০০ মিটারেরও বেশি আগে একটি জায়গায়।
অর্থাৎ, ‘ফ্লাইওভারে ওঠার সময় বিপত্তিতে পড়েন নারী বাসচালক’ বলে যে দাবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা সত্য নয়। ফ্লাইওভারে ওঠার বহু আগেই বাসটি তিনি থামান।
দ্বিতীয়ত, ভাইরাল হওয়া ফুটেজটি কে ধারণ করেছেন তা জানতে ফুটেজটি প্রকাশকারী বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারা সবাই জানিয়েছেন ফুটেজটি তাদের কোন স্টাফ ধারণ করেনি। একটি সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা ফুটেজটি পেয়েছেন দৈনিক নিরপেক্ষ এর স্টাফ রিপোর্টার মিসবাহ উদ্দিনের কাছ থেকে।
মিসবাহ উদ্দিন দ্য ডিসেন্টকে জানান, ফুটেজটি তার ধারণ করা। “আমি একজনকে শেয়ার করেছিলাম। তার কাছ থেকে হয়তো অন্যদের কাছে গিয়েছে”, বলেন তিনি।
মিসবাহ তার দেখা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, “আমি ওই বাসে ছিলাম। কিছু ইনসার্ট শর্ট নিচ্ছিলাম। তখন শাহজাহানপুর মোড় পার হয়ে বাসটি খিলগাঁও ফ্লাইওভারের দিকে যাচ্ছিল। ওইদিন গাড়িগুলো রাস্তায় নামার প্রথম দিন হওয়ায় বাসে নারী চালকদের সাথে সিনিয়র পুরুষ চালকরাও ছিলেন। ওই বাসে থাকা একজন পুরুষ চালক ফাহিমা সানজানকে বলেন, ‘সামনে ফ্লাইওভার। একটু সাবধানে চালাতে হবে। তুমি সরে আসো, আমিই বসি।’ তাতে প্রথমে ফাহিমা রাজি না হলেও পরে তিনি চালকের সিট থেকে উঠে পুরুষ চালককে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেন।’
মিসবাহ উদ্দিন বলেন, “ফাহিমা নিজে থেকে বলেননি যে, তিনি ফ্লাইওভারে গাড়ি নিয়ে উঠতে পারবেন না। বরং প্রথম দিন হওয়ায় অতিরিক্ত সতর্কতা বশত সিনিয়র চালক নিজে দায়িত্ব নিয়েছেন। ওখানে আরও সাংবাদিকরা ছিলেন তারাও দেখেছেন।”
দ্য ডিসেন্ট ফাহিমার সাথে কথা বলার জন্য বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিআরটিসি জনসংযোগ কর্মকর্তা মুস্তাকিম ভুইয়ার মাধ্যমে যোগযোগের চেষ্টা করলে তিনি জানান, ফাহিমা গাড়িতে আছেন। ডিউটি শেষ করার আগে তাকে ফোনে পাওয়া যাবে না।
ডিউটি শেষ হওয়ার পরও তিনি দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিনিধিকে বলেন, “প্রথম দিন যেহেতু তাই ফ্লাইওভারে ওঠার আগে ওস্তাদ বলেছিলেন উনি নিজে বসবেন। আমি বললাম, না আমি পারবো। পরে উনার কথা মতো আমি ওঠে আসি। ওই সময় আমার পানিরও পিপাসা ছিল। সকাল থেকে নাস্তা করিনি। তাই আমি ভাবলাম ঠিক আছে উনিই চালাক। তখন আমি সরে যাই সিট থেকে। ওইসময় সাংবাদিকরা ভিডিওটি করেন।”
গতকাল বুধবার একটি টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারেও ফাহিমা চালকের আসন পরিবর্তনের কারণ হিসেবে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সাংবাদিক মিসবাহ উদ্দিনের বর্ণনার সাথে মিলে।
ফাহিমা বলেছেন, “আমি আমার ড্রাইভিং সিট থেকে উঠে পানি খাওয়ার জন্য নামি। তখন ওস্তাদ এসে আমার সিটে বসে। আমি বললাম, ওস্তাদ, আমি পারব। পরে ওস্তাদ বলল, না, আমিই চালাই। আমি যে বাস নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠতে পারি না, বিষয়টা এমন নয়।’
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের উদ্দেশে ফাহিমা বলেছেন, “ফ্লাইওভারে উঠতে না পারলে কি এমনি এমনি স্টিয়ারিং হাতে নিয়েছি? আগামীকাল সাংবাদিক ভাইয়েরা নিশ্চয়ই আসবেন, যখন আমি ফ্লাইওভারে গাড়ি চালাব।”