চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নয়, এবার যেন চিকিৎসকের মুখ আর কণ্ঠস্বরই হয়ে উঠেছিল প্রতারণার হাতিয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে ইউরোলজিস্ট ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলামের ছবি ও কণ্ঠস্বর নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছিল ভিডিও। সেখানে প্রস্টেট, শারীরিক ও যৌন দুর্বলতাসহ নানা সমস্যার ‘সমাধান’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল ‘Prostulin F’ নামের একটি পণ্য। এমন অভিযোগে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের দুই সদস্যকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বৃহস্পতিবার রাতে ডিএমপির পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন তানভির আলম ওরফে রাহাত (২৩) ও মো. নূরনবী ইসলাম ওরফে মানিক (২৩)। ১৮ ও ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামি ও পাঁচলাইশ এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তিনটি মোবাইল ফোন, সিম কার্ড এবং সাতটি ভুয়া ভেষজ ফুড সাপ্লিমেন্ট জব্দ করা হয়েছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতারকরা প্রথমে ওই চিকিৎসকের নাম, ছবি ও পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডি ও পেজ তৈরি করে। এরপর এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর ছবি ও কণ্ঠস্বরের আদলে ভিডিও বানিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। ভিডিও দেখে যেন মনে হয়, চিকিৎসক নিজেই পণ্যটির কার্যকারিতার কথা বলছেন—এমনভাবেই কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর ওই ভিডিওর মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হতো। বিশেষ করে প্রস্টেটের সমস্যা, শারীরিক দুর্বলতা ও যৌন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে নানা ধরনের আশ্বাস দেওয়া হতো। চিকিৎসকের পরিচিতি ব্যবহার করায় বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছিল। পুলিশের ভাষ্য, এতে একদিকে প্রতারণার শিকার হচ্ছিলেন ক্রেতারা, অন্যদিকে অননুমোদিত বা ভেজাল পণ্য ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ওই চিকিৎসকের নিজের পরিচয় অপব্যবহারের বিষয়টি জানার পর। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করেন। পরে চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি জানিয়েছে, জব্দ করা মোবাইলসহ ডিজিটাল ডিভাইসের প্রাথমিক যাচাইয়ে ভুয়া ফেসবুক পেজ এবং প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত মিলেছে। ফলে এই চক্র শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ কি না, নাকি এর পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে—সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে তদন্তকারী দল।