Image description

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে এক প্রতিবেদনে। সংগঠনটির হিসাবে, এর মধ্যে ৪০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৪ জন।

ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনটির বরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
 কলকাতা২৪x৭এগিয়ে বাংলা নিউজবর্তমান বাংলাআজতক বাংলাএএনআইহিন্দুপোস্টট্রিপুরা ইন্ডিয়াএশিয়ানেট নিউজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ৪৪ জন নিহত ও ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক হামলার তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা ‘ধারাবাহিক নিপীড়নের শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ঐক্য পরিষদের রিপোর্টকে সূত্র হিসেবে ধরে যেসব প্রতবিদেন প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোতে “সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা” , “সাম্প্রদায়িক হামলা” , “হিন্দু অত্যাচার” , “হিন্দুদের ওপর নির্যাতন”, “সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার”, “ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন”, “সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রধান অস্ত্র”, “ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা”, “সংখ্যালঘুদের নিশানা করে শত শত নির্যাতনের ঘটনা” এবং “সাম্প্রদায়িক সহিংসতা” এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

দ্য ডিসেন্ট ঐক্য পরিষদের তালিকাভুক্ত ৪০টি ঘটনার বিবরণ (৪৪ জনের হত্যাকাণ্ড) এবং এই ঘটনাগুলো সংক্রান্ত যেসব খবর বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছে। 

পর্যালোচনায় এই ৪৪টি হত্যাকাণ্ডের তালিকায় এমন বেশ কিছু ঘটনা পাওয়া গেছে, যেগুলোকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘সহিংসতা’র ঘটনা বলেও চিহ্নিত করা যায় না।

দ্য ডিসেন্ট এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে ‘সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিকটিম সাধারণ ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা গেছেন। এমনকি নিজের ছিনতাই হওয়া অটোরিকশার পেছনে দৌঁড়াতে গিয়ে ট্রাকচাপায় এক কিশোরের মৃত্যুকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ঐক্য পরিষদ। কয়েকটি ঘটনায় ব্যক্তিগত, জমি সংক্রান্ত ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

 

অস্বাভাবিক মৃত্যুই ‘সহিংসতা’, ‘সাম্প্রদায়িক’ এর নেই কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড

দ্য ডিসেন্ট ঐক্য পরিষদের কাছে জানতে চেয়েছিল, তাদের ষাণ্মাসিক প্রতিবেদনে ৪৪টি হত্যাকাণ্ডকে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে সংগঠনটির কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা মানদণ্ড রয়েছে কিনা এবং ঘটনাগুলোর তথ্য ও বিবরণ তারা কীভাবে সংগ্রহ করে থাকেন।

সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, কোন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে নির্ধারণের জন্য তাদের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড নেই।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো সংখ্যালঘু ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সত্য কিনা, তা স্থানীয়ভাবে যাচাই করে সংগঠনটি। আর সেই ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’কেই তারা ‘সহিংসতা’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

দ্য ডিসেন্ট যখন তালিকার তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ তার সামনে তুলে ধরে জানতে চায়, এগুলো কীভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তালিকায় এলো, তখন প্রথমে তিনি সেগুলোকে ‘সহিংসতা’ বলেন। তবে পরে বলেন, ঘটনাগুলো ‘নরমাল’ ঘটনার মধ্যে পড়তে পারে এবং তালিকা থেকে ‘বাদ যেতে পারে’।

এ ব্যাপারে মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, “যেগুলি পত্র-পত্রিকায় হত্যা বলে উল্লেখ করা হয় সেগুলি আমরা নিই। একটা লোককে হত্যা করে ফেলে রাখছে। তাকে হত্যা করে ফেলছে, নিশ্চয় কেউ তাকে আক্রোশ থেকে হত্যা করছে অথবা তাকে দুর্বল ভেবে আক্রোশ করেছে। মাইনোরিটি বিধায় তার ওপর এ ধরনের একটা আক্রোশ।”

তিনি আরও বলেন: “এখন অহরহ এগুলি ঘটে চলছে। যদি একটা দুইটা হতো আমরা মনে করতাম যে ঠিক আছে। কিন্তু একের পর এক বিভিন্ন ঘরে ঢুকে গলা কেটে মেরে ফেলছে, কোথাও মেরে ডেড বডি রাস্তার পাশে পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও তাকে অ্যাটাক করে মারছে। এগুলি তো বিভিন্ন ঘটনাগুলি আমরা ডিটেইলস... আমরা এমন কোন ঘটনা এখানে নিজেরা বানিয়ে দেই নাই। প্রত্যেকটি ঘটনার সূত্র রয়েছে এবং সেগুলি সত্য ঘটনা।”

সংবাদমাধ্যম থেকে ঘটনা সংগ্রহের পর সংগঠনটি স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে ঘটনাটির সত্যতা এবং প্রকৃতি যাচাই করে কিনা জানতে চাইলে জবাবে মনীন্দ্র কুমার নাথ  দ্য ডিসেন্টকে বলেন. “হ্যাঁ খোঁজ নিই, ওই ঘটনার সত্যতা, ওই ঘটনা ঘটছে কিনা। পত্রিকা তো আর এমন কোন ফালতু খবর ছাপে না। ঘটনা ঘটছে এবং তার নরমাল মৃত্যু নয়। অ্যাবনরমাল মৃত্যুটাকেই আমরা সহিংসতা বলছি।”

অর্থাৎ, তার বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার সত্যতা স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেন। তবে কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয় কাজ করেছে কি না, সেটি যাচাই করার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা মানদণ্ড তিনি উল্লেখ করেননি।

তিনজন হিন্দু নিহতের ঘটনা ‘সহিংসতা’, তবে ‘বাদ যেতে পারে’ বললেন মনীন্দ্র কুমার নাথ 

দ্য ডিসেন্ট ঐক্য পরিষদের প্রকাশ করা তিনটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মনীন্দ্র কুমার নাথকে পড়ে শোনায়। 

ঐক্য পরিষদ ও সংবাদমাধ্যমে পাওয়া তথ্য মতে, তিনটি ঘটনা হলো:

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ভোরে ডাকাতেরা চন্দন দের গোয়াল থেকে গরু নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাধা দেন। এ সময় ডাকাতেরা তাকে গুলি করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

৮ মার্চ রাতে ফেনীতে যাত্রীবেশী দুই ছিনতাইকারী কিশোর অটোরিকশাচালক শান্ত কুমার সাহাকে ধাক্কা দিয়ে সড়কের পাশের একটি ডোবায় ফেলে তার অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। ডোবা থেকে উঠে শান্ত অটোরিকশাটির পেছনে দৌড়ানোর সময় পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রাক তাকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

আর ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। তার ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হয়। মাথায় গুরুতর আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে কোটবাড়ী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

দ্য ডিসেন্ট জানতে চায়, এসব ঘটনার সঙ্গে ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পর্ক স্পষ্ট না হলেও সেগুলো কীভাবে প্রতিবেদনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আওতায় এল।

মনীন্দ্র কুমার নাথ  প্রথমে বলেন, “যে ঘটনাটাই ঘটছে, সরকার সেটা ইনভেস্টিগেট করছে কিনা? এখন এটা তো মূল ঘটনা যে, আজকে সে কি এদেশে সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই এই হত্যাটা হচ্ছে, নাকি নরমাল?”

বুলেট বৈরাগী একজন কাস্টমস কর্মকর্তা ছিলেন এবং ছিনতাইকারীরা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানত কিনা– এ প্রশ্নের পর তিনি বলেন. “সহিংসতা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সবগুলি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা।”

দ্য ডিসেন্ট তখন স্পষ্ট করে যে, সংগঠনের পুরো প্রতিবেদনেই এসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আওতায় উপস্থাপন করা হয়েছে। জবাবে তিনি বলেন, “বলছি টোটাল রিপোর্টে সহিংসতা। দিস ইজ অলসো একটা সহিংসতা।”

এরপর দ্য ডিসেন্ট ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদন থেকে আরও ১৫/১৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করে, যার মধ্যে জমি-সংক্রান্ত বিরোধও ছিল এবং যেগুলোতে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। জমি নিয়ে চলা দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে কেউ হত্যার শিকার হলে হলে সেটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নাকি সাধারণ সহিংসতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সহিংসতা তো অবশ্যই।”

তবে প্রথমে দ্য ডিসেন্টের উত্থাপন করা তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে আবার জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনি যে তিনটার কথা বলছেন, সেই তিনটা হয়তোবা ইন-ন্যাচারাল নরমাল এর ভিতরে অথবা সহিংসতার কোনো কিছু নাই, এটা আপনি বলতে চাচ্ছেন। সেই তিনটা হয়তোবা বাদ যেতে পারে। ঠিক আছে তিনটা বাদে ৪৪টার মধ্যে বাকীগুলো অস্বীকার করার তো সুযোগ নেই।”

এরপর ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ সেলের সদস্য অ্যাডভোকেট দীপঙ্কর ঘোষের সঙ্গেও যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট।

প্রতিবেদনে থাকা ঘটনাগুলো কোন মানদণ্ডে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংগঠনটির কোনো লিখিত সংজ্ঞা বা নির্দেশিকা রয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনিও নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেননি।

 

আরও যেসব ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ মেলেনি

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তালিকাভুক্ত ৪৪টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দ্য ডিসেন্ট ১৬টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে। এসব ঘটনায় ঐক্য পরিষদের দেওয়া তথ্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশ, র‍্যাব, নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। দ্য ডিসেন্ট কোন ঘটনাই মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করেনি।

এই বিশ্লেষণে অন্তত এই ১৬টি ঘটনার এমন সব বর্ণনা ও তথ্য পাওয়া গেছে যেগুলো পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা হিসেবে প্রতীয়মাণ হয় না। বাকি ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত নয়।

তালিকার প্রথম দিকে থাকা খোকন চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড ঘিরে এর আগে ‘ইসলামিস্ট মবের’ হামলার দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফার্মেসি বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

সে সময় এ ঘটনাকে ঘিরে "ইসলামিস্ট মব" বা সাম্প্রদায়িক হামলার দাবি প্রচারিত হলেও দ্য ডিসেন্টের ফ্যাক্টচেকে সেই দাবি অসত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ফ্যাক্টচেকে পুলিশ, নিহতের স্ত্রী, স্বজন ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ জানায়, ছিনতাইয়ের সময় খোকন চন্দ্র দাস জড়িতদের চিনে ফেলায় তাঁকে তারা কুপিয়ে, আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। নিহতের স্বজনেরাও ঘটনাটিকে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানিয়েছেন। তার স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় মুসলিমদের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ ছিল না। 

রিপন সাহার মৃত্যু হয় গোয়ালন্দের একটি ফিলিং স্টেশনে। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, তেলের টাকা চাওয়ার পর তাকে গাড়িচাপা দেওয়া হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি গাড়িতে পাঁচ হাজার টাকার তেল নেওয়ার পর মূল্য পরিশোধ না করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে রিপন সাহা টাকা চান। এর পর তাকে গাড়িচাপা দেওয়া হয়। পুলিশ পরে গাড়িটি জব্দ করে এবং গাড়ির মালিক সাবেক বিএনপি নেতা আবুল হাসেম সুজন ও চালক কামাল হোসেনকে আটক করে। প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে হামলার কোনো তথ্য নেই; বরং তেলের মূল্য পরিশোধকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল।

গাজীপুরে লিটন চন্দ্র ঘোষের হত্যাকাণ্ড নিয়েও সাম্প্রদায়িক হামলার দাবি ছড়িয়ে পড়ে। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি মিষ্টির দোকানে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কর্মচারী অনন্ত দাসের সঙ্গে মাসুম মিয়ার কথা-কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতি হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে গেলে লিটন চন্দ্র ঘোষকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে শাবল দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তিনি মারা যান।

পরে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়, দোকানে দেবতার ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেকে বলা হয়, দোকানে দেবতার ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের দাবিটি সঠিক নয়; বরং কলার ছড়া চুরিকে কেন্দ্র করে আকস্মিক সংঘর্ষের একপর্যায়ে লিটন চন্দ্র ঘোষ নিহত হন।  একইভাবে গাজীপুর জেলা পুলিশও জানায়, এটি পূর্বপরিকল্পিত বা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিরোধের ঘটনা নয়; তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মারামারির ফল।

মধু চন্দ্র শীলের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের জমির সীমানা নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে বচসার একপর্যায়ে ধাক্কা খেয়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান। যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাড়ির সামনে গাছ লাগানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ধাক্কা খেয়ে মধু চন্দ্র শীল নলকূপের পাকা অংশে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বগুড়ায় সুনীল বাঁশফোরের হত্যার পেছনে চাঁদা দাবির তথ্য রয়েছে। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার কাছে ৫০০ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনেও বলা হয়, অনিক নামে এক মাদক কারবারি ৫০০ টাকা চাঁদা চাওয়ার পর তর্কের একপর্যায়ে সুনীল বাঁশফোরকে ছুরিকাঘাত করেন। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। নিহতের বাবা এ ঘটনায় হত্যা মামলা করেন।

চট্টগ্রামে চন্দন দে নিহত হন নিজের গোয়াল থেকে গরু ডাকাতির সময় বাধা দিতে গিয়ে। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বর্ণনাও মিলে যায়—ভোরে একটি ডাকাত দল এলাকায় হানা দিয়ে কয়েকটি গোয়াল থেকে গরু নিয়ে যাচ্ছিল। নিজের গরু নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিলে চন্দন দেকে গুলি করা হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যেও ঘটনাটিকে ডাকাতির সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে।

আকাশ দাসের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিটাক বাজার মোড় এলাকায় কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁর সহকর্মী মাইকেলকে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করে। আকাশ দাস বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা তাঁকে হেলমেট দিয়ে আঘাত করে এবং ছুরিকাঘাত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বিডিনিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে শুরু হয়। পুলিশ জানায়, মাইকেল নামে আকাশের এক সহকর্মীকে পাওনা টাকার জন্য কয়েকজন ব্যক্তি টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তাঁকে ছাড়াতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে আকাশ দাসকে ছুরিকাঘাত, হেলমেট দিয়ে আঘাত ও মারধর করা হয়। পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

চয়ন রাজভরের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ শাহীন ফকির ও তাঁর সহযোগীরা চয়ন রাজভরকে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর ভাইও আহত হন। 

যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, চয়ন রাজভরের সঙ্গে শাহীন ফকিরের দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ চলছিলো। এ বিষয়ে আদালতে একাধিক মামলাও বিচারাধীন ছিল। বিরোধপূর্ণ জমিতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে চয়ন রাজভর ও তাঁর ভাই ছুরিকাঘাতে আহত হন। পরে হাসপাতালে চয়ন রাজভর মারা যান। 

কক্সবাজারে গণেশ পালের হত্যার ঘটনায়ও চাঁদা দাবির তথ্য পাওয়া যায়। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করা হয়। যুগান্তরের প্রতিবেদনেও চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথা বলা হয়েছে। পুলিশ পরে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে দুই কথিত মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করে। প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে বলা হয়, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির ঘটনা চলে আসছিল এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গণেশ পালের ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে।

শান্ত কুমার সাহার হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই ব্যক্তি যাত্রী সেজে তাঁর অটোরিকশায় ওঠেন। নির্জন স্থানে পৌঁছে তাঁকে মহাসড়কের পাশের একটি খাদে ফেলে দিয়ে অটোরিকশা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। শান্ত ওই ব্যক্তিদের ধরার জন্য অটোরিকশার পেছনে দৌড়ানোর শুরু করলে একটি দ্রুতগামী ট্রাক তাঁকে চাপা দেয় । এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, যাত্রীবেশে ওঠা দুই ছিনতাইকারী নির্জন স্থানে শান্ত কুমার সাহাকে ডোবায় ফেলে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে তিনি ছিনতাই হওয়া অটোরিকশার পেছনে দৌড়ালে একটি ট্রাক তাঁকে চাপা দেয়। পুলিশ ঘটনাটিকে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে তদন্ত করছে।

উজ্জ্বল কর্মকারের হত্যাকাণ্ডের পেছনেও জমি ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরমুজ চাষের জমি লিজ নেওয়া ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে তার ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা হয়। বিডিনিউজের প্রতিবেদনেও তরমুজ চাষের জমি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষের কথা বলা হয়। একই ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন।

বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী নিহত হন। পরিবারের অভিযোগের পর পুলিশ তাঁর লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় র‌্যাব সন্দেহভাজন তিন ছিনতাইকারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। লাশ উদ্ধারের সময় তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে র‌্যাবের বরাতে বলা হয়, বুলেট বৈরাগী সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের শিকার হন। চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে বাসায় ফেরার পথে চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা চক্রের সদস্যরা তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এবং তাঁর মুঠোফোন, টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। একপর্যায়ে তাঁকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দিলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

কৃষ্ণ রাজবংশীর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাছ চুরির অভিযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাঁকে বাজার সমিতির কক্ষে আটকে মারধর করেন এবং তাঁর পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা দিতে সম্মতি জানানো হলেও নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে লাশ ঝুলিয়ে রেখে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।

প্রথম আলো ও বিডিনিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কৃষ্ণ রাজবংশীকে মাছ চুরির অভিযোগে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ে আটকে রেখে মারধর করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল এবং টাকা দিতে না পারায় নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে।

দীপালী শিকদারের মৃত্যুর বর্ণনায় পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক কর্মচারী অক্সিজেনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বজনরা অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ করেন এবং পরে অভিযুক্ত কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দীপালী শিকদারকে ট্রলিতে রেখে অক্সিজেন দেওয়ার নির্দেশ ছিল। তাঁর ভাইয়ের অভিযোগ, ট্রলিম্যান অন্য এক রোগীকে ট্রলি দেওয়ার জন্য অক্সিজেনের নল খুলে ফেলেন, যার কয়েক মিনিট পর দীপালী মারা যান।

ভবতোষ মৃধার হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বের জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্থানীয় গফুরের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হামলায় তাঁর স্ত্রীও আহত হন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের আঁধারে সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা ভবতোষ মৃধাকে কুপিয়ে হত্যা করে। নিহতের স্ত্রী বিভা মৃধা হামলাকারীদের মধ্যে গফুর নামের একজনকে শনাক্ত করার দাবি করেন এবং জমিজমা নিয়ে পূর্বশত্রুতার কথা জানান। পুলিশও প্রাথমিক তদন্তে পূর্বশত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছে। 

শ্যামল চন্দ্র মালীর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধান কাটার প্রসঙ্গে 'কামলা' সম্বোধন করাকে কেন্দ্র করে হাসান আলীর সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হাসান আলী গাছের ডাল দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্যামল চন্দ্র মালী গ্রামের একজনের জমির ধান কাটার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হাসান আলীকে 'কামলা' বলে সম্বোধন করেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং একপর্যায়ে হাসান আলী ক্ষিপ্ত হয়ে গাছের ডাল দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা কী

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (United Nations Office on Drugs and Crime-UNODC) সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে এমন সংঘাত বা সহিংসতা হিসেবে বর্ণনা করে, যা ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, একই ধর্মের ভিন্ন উপদল বা গোত্র, জাতিগত গোষ্ঠী কিংবা জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত হয়। তবে দুই ব্যক্তি বা দুই পরিবারের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধকে তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে না।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর সংজ্ঞা অনুসারে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বলতে ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, ভাষা বা বর্ণের পার্থক্যের ভিত্তিতে ঘটা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত সহিংসতাকে বোঝায়।

Folke Bernadotte Academy (FBA), Peace Research Institute Oslo (PRIO) এবং UN Women-এর ২০২০ সালে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা দুই বা ততোধিক সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সংঘাতে রাষ্ট্র কোনো পক্ষে জড়িত থাকে না।

দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ACCORD-এ প্রকাশিত এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষকদের একটি গবেষণা নিবন্ধে communal conflict-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠিত রাষ্ট্রবহির্ভূত দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত সহিংস সংঘাত হিসেবে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এসব সংজ্ঞায় ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, ভাষা বা অন্য কোনো সামষ্টিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতাকেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা অন্যান্য সাধারণ অপরাধকে কেবল ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা এসব সংজ্ঞায় উল্লেখ নেই।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফি মোঃ মোস্তফা দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদন দেখলে মনে হয় তারা খবরগুলোর কন্টেন্ট অ্যানালাইসিস করেছে, কিন্তু ডিসকোর্স বা ন্যারেটিভ অ্যানালাইসিস করেনি। ফলে ঘটনায় হয়ত হিন্দু বা সংখ্যালঘু ধর্মের কেউ মারা গেছে, কিন্তু কেন কিভাবে মারা গেল সেই আলোচনা উঠে আসেনি।”

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির অবস্থা, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে তাদের সংকট এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন তিনি।

সংখ্যালঘু হামলা বলতে আমরা আসলে কী বুঝবো দ্য ডিসেন্টের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সহজ ভাষায় যদি বলি, আপনার সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে অথবা সেই পরিচয়কে টার্গেট করে যেকোনো ক্ষতিসাধন করা বা করতে চাওয়ার চেষ্টাকেই সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনা হিসেবে ক্লাসিফাই করা হয়; ইসলামোফোবিয়ার ক্ষেত্রে যেমনটা সবজায়গায় আছে।” 

ফলে যেকোনো ঘটনা ঘটলে শুধু ঘটনাটি না দেখে, তার আগে-পরে ধর্মীয় পরিচয় কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা ছাড়া যেকোনো কিছুকে সংখ্যালঘু আক্রমণ বলে দেওয়া কঠিনই বলে মনে করেন তিনি।

এর আগে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে নেত্র নিউজের একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল; সেটি উল্লেখ করে তিনি তাদের প্রতিবেদনগুলোতে আরও বেশি পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা আনার আহ্বান জানান। 

“এই ধরনের প্রতিবেদনে গবেষণার পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা বেশি থাকলে সত্যিকারের সংখ্যালঘু হামলা, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে" বলে মনে করেন তিনি। 

গবেষক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, বাংলাদেশে "সাম্প্রদায়িক সহিংসতা", "ফৌজদারি অপরাধ" এবং "মানবাধিকার লঙ্ঘন"—এই তিন ধরনের অপরাধের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য সবসময় স্পষ্টভাবে করা হয় না। তাঁর মতে, কোনো হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে সেটি ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়গত পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ধারণা নির্ণয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই একটি পদ্ধতিগত সমস্যা রয়েছে। অনেক সময় একই তালিকায় ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলা, ব্যক্তিগত বিরোধ, ডাকাতি, ছিনতাই, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধকে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোন ঘটনাটি পরিচয়ভিত্তিক সহিংসতা আর কোনটি ফৌজদারি অপরাধ—সে পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হলেই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ডাকাতির সময় বাধা দেওয়ায় কাউকে হত্যা করা, ছিনতাইয়ের সময় হত্যাকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, কিংবা ব্যক্তিগত বা জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধে সংঘটিত হত্যাকে আইনগতভাবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু কেবল ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বলা যাবে কি না, সেটি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।”

তার মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে ডকুমেন্টেশন ও রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে। অনেক সময় সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা যাচাই ছাড়াই তালিকাভুক্ত করে, ফলে তত্ত্ব, তথ্যগত এবং প্রায়োগিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তিনি বলেন, “কোনো ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার আগে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ, ঘৃণা বা লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।”

একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ক্ষমতার পালাবদলের সময় সংখ্যালঘুদের জমি দখল, সম্পত্তি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা নারীদের ওপর সহিংসতার মতো পরিচয়ভিত্তিক হামলার ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটে এবং এসব অভিযোগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের ঘটনাগুলো বাস্তব এবং সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও নথিভুক্তি প্রয়োজন।

তবে তার মতে, পরিচয়ভিত্তিক সহিংসতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হলে প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। তিনি বলেন, "হিন্দু ধর্মাবলম্বী কেউ নিহত হলেই সেটিকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলা যাবে না। আবার একই সঙ্গে প্রকৃত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলোও যেন আড়ালে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।" এ কারণে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রকাশিত তথ্য ও ঘটনাগুলোর শ্রেণিবিন্যাস আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই ও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন এবং সরকারের উচিত একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করা উচিত বলে মনে করেন তিনি ।

তিনি আরো বলেন, একই ধরনের শ্রেণিবিন্যাসগত ভুল যদি বারবার ঘটে, তাহলে সেটিকে আর নিছক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়। তাঁর ভাষায়, "প্রথমবার এ ধরনের ভুল হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। দ্বিতীয়বার একই ভুল হলে সেটি একটি সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। আর তৃতীয়বার একই ধরনের ভুল হলে সেটি চিন্তাভাবনা করে নেওয়া একটি অবস্থান, যা এক ধরনের অপরাধ বলেও বিবেচিত হতে পারে।”