২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে। একই সঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে পুরোনো উগ্রপন্থী শক্তিগুলো। নতুন রাজনৈতিক পরিসর খিলাফত কিংবা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নতুন গোষ্ঠীগুলোকেও উৎসাহিত করে।
মূলত এসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল মনে হয়েছিল। নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো বাধাহীনভাবে সমাবেশ, মিছিল ও বৈঠক করতে শুরু করে। নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় মিছিল করে প্রকাশ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক দেয় হিযবুত তাহরীর।
পুরোনো ও নতুন উগ্রপন্থী শক্তিগুলো সেমিনার, ওয়াজ মাহফিল, ধর্মীয় সমাবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাতেও ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি অনলাইনে বাড়তে থাকে প্রচার। আফগানিস্তানে তালেবানের মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যেতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন মঞ্চে আনার চেষ্টাও জোরদার হয়।
এরপর দেশজুড়ে একের পর এক ঘটতে থাকে উদ্বেগজনক ঘটনা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় শক্তিশালী বিস্ফোরণে একটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনায় আহত হন চারজন। তদন্তকারীরা বিস্ফোরণের সঙ্গে উগ্রপন্থীদের সম্পৃক্ততা খুঁজে পান এবং এমন দুজনকে শনাক্ত করেন, যারা এর আগে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার এক নারীও কথিত জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আগে কারাবরণ করেছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের পর উদ্ধার হওয়া একটি মুঠোফোনের সূত্র ধরে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি যশোরে নিষিদ্ধ নব্য জেএমবির নেতা হাফিজ খালিদ ইব্রাহিমের ব্যক্তিগত গাড়িচালকের বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। সেখান থেকে ১০টি শক্তিশালী গ্রেনেড, বিদেশে তৈরি তিনটি পিস্তল, ১৯টি গুলি এবং অন্য অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
এসব ঘটনা তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত নিরাপত্তা পদক্ষেপ দাবি করলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্রমবর্ধমান উগ্রপন্থী হুমকি মোকাবিলায় অনাগ্রহী ছিল বলেই মনে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন নির্যাতিত হওয়ার দাবি করে আসা ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ‘অসন্তুষ্ট’ করার আশঙ্কা থেকেই সরকার এমন অবস্থান নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
অবশ্য সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি বেশ বিপজ্জনক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
উগ্রবাদ এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, যাকে প্রয়োজনমতো সহ্য করা যায়। বাংলাদেশকে আফগানিস্তানধাঁচের ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলোকে অবাধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া যায় না।
গত এপ্রিলে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে কথিত সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যসহ ২০ জনকে আটক করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর নানা মহলে বড় ধরনের বিস্ময় সৃষ্টি হলেও, এটিই ছিল বাস্তবতা।
এরপর সন্দেহভাজন জঙ্গি তৎপরতার আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা, কুমিল্লা, আশুলিয়া ও সাভারে বোমা বিস্ফোরণ এবং পাইপ বোমা ও প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীরা এখন বলছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে কয়েকটি উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে।
জঙ্গিবাদের সত্য মুছে দেওয়ার বিপজ্জনক চেষ্টা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে জঙ্গিবাদ নিয়ে জনপরিসরের বয়ান পাল্টে দেওয়ার একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টাও সম্প্রতি দৃশ্যমান হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করতে শুরু করেন, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কোনো জঙ্গিবাদই ছিল না এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানগুলো মূলত ছিল ‘নাটক’। জঙ্গিবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও একই ধরনের দাবি করতে থাকেন।
পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশও এই বয়ানকে জোরদার করে। কিছু প্রতিবেদনে জঙ্গিবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আগের সরকারের ‘নিরপরাধ শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
অনেক মানুষ ওই সময় মিথ্যা অভিযোগের শিকার হয়েছেন কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ভুক্তভোগী হয়েছেন- সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সন্ত্রাসবিরোধী সাফল্যের চিত্র দেখাতে সে সময় কিছু অভিযান সাজানোও হয়েছিল।
কিন্তু সেসব অভিযানের সবই ভুয়া ছিল- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমানভাবে বিপজ্জনক।
ওই অভিযানগুলোতে প্রকৃত জঙ্গিরাও গ্রেপ্তার হয়েছিল এবং সত্যিকারের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানও চালানো হয়েছিল। বাংলাদেশে একাধিক প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলাও ঘটেছে।
২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থান এবং তাদের মতাদর্শের বিস্তার নতুন প্রজন্মের উগ্রপন্থীদের অনুপ্রাণিত করে। শাহবাগ আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়ে মুফতি জসিমউদ্দিন রহমানী বসিলায় তার মাদ্রাসায় দেওয়া বক্তব্যে প্রকাশ্যে ব্লগার ও নাস্তিকদের হত্যার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এরপর দেশে সন্ত্রাসবাদের নতুন একটি পর্যায় শুরু হয়। ইসলামিক স্টেট এবং ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার মতাদর্শে অনুপ্রাণিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে ব্লগার, শিক্ষক, সমকামী অধিকারকর্মী ও বিদেশিরা হত্যার শিকার হন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় ১৭ বিদেশিসহ ২১ জন নিহত হন। সেখানে পরবর্তী সেনা অভিযানে ইসলামিক স্টেটের পাঁচ অনুসারী নিহত হন।
এসব ঘটনা কোনো নাটক ছিল না। হাসিনা সরকার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে ব্যবহার করেছিল বলেই এসব বাস্তব ঘটনা ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায় না।
হত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ২০১৪ সালে রহমানীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজাও ভোগ করেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে নতুন নতুন মামলা দিয়ে তাকে বেআইনিভাবে কারাগারে আটকে রাখে।
সরকারের এই বেআইনি পদক্ষেপ সত্য হলেও, তার আগের উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড কাল্পনিক হিসেবে প্রমাণিত হয় না। হাসিনার পতনের পর যারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, রহমানী তাদের একজন। এখন তার মতো অনেকেই প্রকাশ্যে তৎপর রয়েছেন।
আমি ২০০২ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে আসছি। পাশাপাশি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ড. জাসমিন লর্চের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বইয়ের জন্য বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন গবেষণা করেছি। ‘বাংলাদেশে নারী ও সন্ত্রাসবাদ: জিহাদি নেটওয়ার্কে নারীর সম্পৃক্ততা ও ভূমিকা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমস্যা’ শিরোনামের বইটি ২০২৪ সালে জার্মানিতে প্রকাশিত হয়।
শত শত পৃষ্ঠার মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং তদন্তকারী, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ ও প্রকৃত এবং সাজানো- দুই ধরনের মামলার সঙ্গেই যুক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে ব্যবহার করেছিল।
শেখ হাসিনা এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে শুধু তার সরকারই জঙ্গিবাদ দমন করতে সক্ষম। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হয় উগ্রপন্থীদের সহ্য করে, নয়তো তাদের সমর্থন দেয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও সেই রাজনৈতিক প্রচারণায় টেনে আনা হয়েছিল। জঙ্গি ‘ধরার’ ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা কখনো কখনো সাজানো অভিযান ও কারসাজিপূর্ণ মামলা তৈরির প্রণোদনাও সৃষ্টি করেছিল।
আমি এমন বহু ঘটনার সন্ধান পেয়েছি, যেখানে নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং অভিযানগুলো ছিল সাজানো। তবে এমন প্রকৃত ঘটনাও পেয়েছি, যেখানে নারী-পুরুষ অনেকেই গভীরভাবে উগ্রপন্থী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশে আল-কায়েদার একটি শাখা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সতর্কবার্তা সরকারের জন্য সবশেষ জোরালো সতর্কসংকেত।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে উগ্রপন্থী শক্তিগুলো টিকে আছে এবং সময়ে সময়ে বিস্তার লাভ করেছে, কারণ ধারাবাহিক সরকারগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবস্থান থেকে তাদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান উত্থানও ইউনূস সরকারের সময় গতি সঞ্চারের সুযোগ পেয়েছে।
উগ্রবাদ মোকাবিলায় যা করতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তিও এড়াতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হতে হবে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর ও প্রমাণভিত্তিক এবং তা বিচারিক তদারকি ও মানবাধিকার সুরক্ষার আওতায় থাকতে হবে।
কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শ রক্ষণশীল কিংবা ইসলামপন্থী হলেই বৈধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার নামে কিংবা অতীতের দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সহিংস উগ্রবাদ, জঙ্গি নিয়োগ ও সন্ত্রাসবাদকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য করা যায় না।
রাষ্ট্রকে বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি নিয়োগ, সহিংস উগ্রবাদ কিংবা সহিংস পন্থায় ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার প্রতি কোনো সহনশীলতা দেখানো যাবে না।
অতীতে বাংলাদেশ দেখেছে—অস্বীকার, রাজনৈতিক কারসাজি ও আত্মতুষ্টি শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যেতে পারে। উগ্রবাদের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপকে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখার মতো সুযোগ বাংলাদেশের নেই।