Image description

রডের মধ্যবর্তী কাঁচামাল উৎপাদন করে চট্টগ্রামভিত্তিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। চলমান গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রায় একই ধরনের প্রভাব পড়েছে ইস্পাত, কাচ, ভোজ্যতেল, অক্সিজেন প্লান্টসহ গ্যাসনির্ভর আরও অন্তত ১০০ ভারী শিল্পকারখানায়। 

নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে গ্যাস সংকটের কারণে ভারী শিল্পের পাশাপাশি প্রায় এক হাজার তৈরি পোশাক কারখানায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন করা হচ্ছে। 

চট্টগ্রামে কাচ, ইস্পাত উৎপাদনে অচলাবস্থা
বিএসআরএম গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন গড়ে আট হাজার টন পণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ আছে। তবে এইচএম স্টিল দিনের দুটি শিফট বন্ধ রেখে শুধু রাতে একটি শিফট চালু রেখেছে। শুধু বিএসআরএম বা এইচএম স্টিল নয়; চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসনির্ভর আরও অন্তত ১০০ ভারী শিল্পকারখানায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতি পোষাতে অনেকে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখছেন। 

বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কম থাকলে কারখানা চালু রাখতে বেগ পেতে হয় আমাদের। অনেক মেশিনারিজ নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে।’ 

এইচএম স্টিলের পরিচালক সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমাদের গোল্ডেন ইস্পাত কারখানা বন্ধ রয়েছে। এইচএম স্টিলে দুটি ইউনিট থাকলেও তাতে দিনের বেলার দুই শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রাতে গ্যাসের চাপ একটু বাড়লে এক শিফটে কারখানা চালু রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’ 

টি কে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কর্ণফুলী স্টিলের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার টন। বুধবার অল্প কিছু উৎপাদন করা গেলেও গত দুই দিন কোনো উৎপাদনই হয়নি। এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু এটা আমাদের জানাটা খুবই জরুরি। বিকল্প জরুরি ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে সরকারকে।’ 

গ্যাস সংকটে কিছু কারখানা বন্ধ রাখার সুযোগ থাকলেও কাচ উৎপাদনের কারখানার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। এর চুল্লি গ্যাসনির্ভর। একবার চুল্লি চালু হলে তা টানা প্রায় এক যুগ সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে কোনো কারণে চুল্লি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় চালুর সুযোগ থাকে না। তখন পুরোনো চুল্লি ভেঙে নতুন চুল্লি স্থাপন করতে হয়, যাতে নতুন করে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্যাস পর্যাপ্ত না থাকায় পিডিবি থেকে সামান্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তা দিয়ে কোনো রকমে শুধু বার্নারগুলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ, চুল্লি একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালু করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। নতুন করে কয়েকশ কোটি টাকা আবার বিনিয়োগ করতে হবে।’

জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, ‘কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ অনেক দিন ধরেই কম। তারপরও উৎপাদন কমিয়ে কোনোভাবে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এখন আর সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। বেড়ে যাচ্ছে পণ্য উৎপাদনের ব্যয়ও।’ 

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহের সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতি করবে না, এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। এনার্জি সিস্টেম নিয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে হবে। 

নারায়ণগঞ্জে পোশাক ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত 
গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় এক হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফতুল্লা গার্মেন্টসের পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, ‘গ্যাস সংকটে গত ২৩ জুলাই থেকে আমাদের ডাইং বন্ধ। এ কয়দিন জমানো থান কাপড় দিয়ে চললেও গতকাল থেকে আমাদের আর জমানো থান নেই। ফলে গার্মেন্টসের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ।’ 

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আমাদের প্রায় পাঁচশ গার্মেন্টস রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে রয়েছে সাব-কন্ট্রাক্টের গার্মেন্টস, ডাইং ও অন্যান্য শিল্প। আমাদের গার্মেন্টগুলো দুই দিন ধরে বন্ধ। যেগুলো গ্যাসনির্ভর লিংকেজ শিল্প, সেগুলোও বন্ধ। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে গার্মেন্টস শিল্পে ধস নামবে।’ 

বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় আমাদের দেড়শ কারখানার প্রায় সবই এখন বন্ধ।’ 

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা জানান, নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে এখন সাতটি লবণ ফ্যাক্টরি রয়েছে। গ্যাসের অভাবে এগুলোর উৎপাদন দুই দিন ধরে বন্ধ। 
সারাদেশে ৪০টি আধুনিক ও ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে। এর একটা বড় অংশই নারায়ণগঞ্জে। এসব মিলে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে না। বাংলাদেশ রি-রোলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ জুয়েল বলেন, ‘অধিকাংশ মিলই আমার জানামতে দুই-তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।’

গার্মেন্টস শিল্পের আরেকটি লিংকেজ শিল্প নিটিং কারখানা। এখানে সুতা থেকে গার্মেন্টসের থান কাপড় তৈরি হয়। এটি বিদ্যুতে চলে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আর তাই এ শিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে জানান বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম সারোয়ার। তিনি বলেন, কেউ কেউ জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ চালানো সম্ভব নয়।

‎জেলার সোনারগায়ের কাঁচপুর ও মেঘনাঘাট শিল্পাঞ্চলে ৩৫টি শিল্পকারখানার উৎপদান গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। মেঘনাঘাট শিল্পাঞ্চলে আমান ইকোনমিক জোনের জিএম নাদিরুজ্জামান বলেন, গ্যাসের অভাবে তিন দিন ধরে তাদের সিমেন্ট কারখানা আট থেকে ১০ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। এতে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। 

ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ খুবই কম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি পাউন্ড সুতায় তাদের ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও পিক আওয়ারে তা নেমে যাচ্ছে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআইয়ে। কখনও কখনও লাইনে গ্যাস থাকেই না। 

রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের প্রেশার এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। 

হবিগঞ্জে ভারী শিল্পের সঙ্গে রপ্তানি খাতও সংকটে
গতকাল সকালে হবিগঞ্জের মাধবপুর ও শাহজীবাজার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এতে সায়হাম গ্রুপের ডেনিমস, কটন, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিলসহ একাধিক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। শুধু সায়হাম গ্রুপই নয়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসংলগ্ন ৩৯টি শিল্পকারখানা এবং ৪২টি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টও একই সংকটে পড়েছে।

এ অঞ্চলে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার ডেনিমস, স্কয়ার টেক্সটাইল, সায়হাম গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, স্টার সিরামিকস, আরএকে সিরামিকস, আকিজ, বেঙ্গল, ম্যাটাডোর, তাফরিদ কটন, ফার ইস্ট স্পিনিংসহ দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইউনিট রয়েছে। 

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাকের্র এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
স্কয়ার ডেনিমসের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, বুধবার বিকেল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। তিন হাজার শ্রমিকের কারখানা এখন শাটডাউন অবস্থায় রয়েছে। 

জেজিটিডিএসএলের শাহজীবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি বলেন, ‘উদ্যোক্তারা বারবার যোগাযোগ করছেন। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের সংকটের কারণে স্থানীয়ভাবে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

ফারইস্ট স্পিনিং মিলের ম্যানেজার সুমন আহমেদ বলেন, গ্যাস না থাকায় তারা সোলার ও জাতীয় গ্রিডের সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো শিল্প খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।

গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)।