Image description
শাহজালালে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে যেন ছেলেখেলা চলছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ৩১ রাউন্ড তাজা গুলি নিয়ে একাধিক নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে গেল একটি ব্যাগ। ব্যাগটি আবার একজন আলোচিত ব্যবসায়ীর। বিমানবন্দরের প্রবেশপথ, হেভি লাগেজ স্ক্যানিং ও চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশি, কোনো স্তরেই শনাক্ত হয়নি বিপজ্জনক এসব গোলাবারুদ। এভাবেই ব্যাগটি নিয়ে বিমানে উঠে দিল্লি পৌঁছে যান আসিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তবে গোলাবারুদসহ ব্যাগটি ধরা পড়ে দিল্লি বিমানবন্দরে। সেখানে স্ক্যানিংয়ের সময় শনাক্ত হলে বিষয়টি দ্রুত জানানো হয় শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় মুহূর্তেই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবার ঘুম যেন হারাম হয়ে যায়। অতঃপর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

এদিকে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, নিরাপত্তাব্যবস্থার সব স্তর পেরিয়ে কীভাবে ৩১ রাউন্ড তাজা গুলিভর্তি ব্যাগ বিমানে উঠে গেল। এছাড়া গুরুতর এই ব্যর্থতার জন্য কারা দায়ী সেটিও চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সিসি ক্যামেরার পুরো ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে তার কাছে মনে হয়েছে-রহস্যজনক কারণে নিরাপত্তা তল্লাশির প্রতিটি ধাপে চরম গাফিলতি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বিধিবহির্ভূতভাবে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মূলত এ কারণে গুলিভর্তি ব্যাগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় নিরাপত্তার কোনো স্তরেই গাফিলতির সুযোগ নেই। একাধিক নিরাপত্তা ধাপ পেরিয়ে ৩১ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ একটি ব্যাগ বিমানে উঠে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা নয়, পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে। নিরাপত্তা তল্লাশির সময় কোনো ব্যক্তিকে প্রাধিকারের বাইরে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আলোচিত ঘটনাটি আরও বিশদ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জানতে চাইলে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগীব সামাদ যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। তদন্তে দায়িত্বে গাফিলতি, নিয়মবহির্ভূত প্রটোকল বা নিরাপত্তা তল্লাশিতে ব্যত্যয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার ও সমন্বিতভাবে মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৬ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৯৭ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার জন্য আসিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, তার ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া ও মেয়ে নুসরাত জুবাইয়ারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন। তাদের লাগেজে বিপজ্জনক গোলাবারুদ থাকার পরও সেটি শনাক্ত হয়নি। এভাবেই নির্বিঘ্নে ঢাকার বিমানবন্দর পেরিয়ে দিল্লি পৌঁছে যান তারা। কিন্তু বিধি বাম! গুলিভর্তি ব্যাগ ধরা পড়ে যায় দিল্লির বিমান বন্দরের স্ক্যানারে। এরপর সেখান থেকে ফোন আসে ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে। খবর শুনে তো সবার পিলে চমকে ওঠে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিব্রত হন। দ্রুত গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

৪ আগস্ট গঠিত তদন্ত কমিটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখতে পায়, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ওই ব্যবসায়ী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। পরে চেক-ইন সম্পন্ন করতে রো-ডি এলাকায় যান। বিমান বাংলাদেশের গ্রাউন্ড সার্ভিস কর্মকর্তা (জিএসও) মিজানুর রহমান ও গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার (জিএসএস) সাইফুল ইসলাম তাদের বিমানবন্দরের বাইরে থেকে ‘অবৈধ প্রটোকলের’ মাধ্যমে হেভি লাগেজ গেট-৬ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করান। ফলে সাধারণ যাত্রীদের মতো নির্ধারিত প্রবেশপথ ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়া তাদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেট-৬-এ তাদের ব্যাগ স্ক্যান করা হয়। দায়িত্বে থাকা স্ক্রিনার সিপাহি মহিনুর স্ক্যানিংয়ের সময় মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ব্যাগের ভেতরে থাকা প্রায় ৩১ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসদৃশ বস্তু শনাক্ত করতে পারেননি। প্রথম ধাপের স্ক্রিনিং পেরিয়ে তারা চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে বোর্ডিং ব্রিজ সি-০১-এ যান। সেখানে চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশি ও ব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সময়ও গুলিভর্তি ব্যাগ শনাক্ত হয়নি। সি-০১-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা (এএসজি) আরিফুর রহমানও ওই ব্যাগটি গোলাবারুদসহ ছেড়ে দেন।

অথচ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় এভিয়েশন সিকিউরিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো যাত্রী ও তাদের মালপত্রে অস্ত্র, বিস্ফোরকসহ নিষিদ্ধ বস্তু শনাক্ত করা। কিন্তু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩১ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ একটি ব্যাগ প্রথম স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়েনি। দ্বিতীয় স্ক্রিনিংয়েও সেটি শনাক্ত হয়নি। এরপর যথারীতি ব্যাগটি বিমানে উঠে যায়।

তদন্ত কমিটি সিসিটিভি পর্যবেক্ষণে আরও গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ডিং ব্রিজ সি-০১-এ স্ক্রিনিং কার্যক্রম চলার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান সংশ্লিষ্ট যাত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময় ও করমর্দন করেন। যে সময়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীর মনিটরে চোখ রেখে ব্যাগের প্রতিটি সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করার কথা, তখনই তিনি যাত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যাত্রীর ব্যক্তিগত বা সৌজন্যমূলক যোগাযোগের সুযোগ কতটা গ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে এ ধরনের আচরণ ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে প্রবেশের পর প্রথমে হেভি লাগেজ গেট-৬-এ স্ক্রিনিং হয়। এরপর চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে বোর্ডিংয়ের আগে আবারও চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশি ও স্ক্যানিং করা হয়। এতগুলো ধাপ অতিক্রম করার পরও যদি ৩১ রাউন্ড গোলাবারুদ বিমানে উঠে যায়, তাহলে শুধু একজন স্ক্রিনারের দক্ষতা নিয়ে নয়; পুরো নিরাপত্তা চেইনের কার্যকারিতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

তিনি বলেন, ফলে ঘটনাটিকে শুধু একজন নিরাপত্তাকর্মীর ব্যর্থতা হিসাবে দেখলে এর প্রকৃত ভয়াবহতা আড়াল হয়ে যাবে। কারণ ব্যাগটি একের পর এক নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ‘অবৈধ প্রটোকল’-এর মাধ্যমে যাত্রীদের প্রবেশ করানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীদের জন্য বিশেষ প্রটোকল বা সহায়তা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সহায়তার কারণে নিরাপত্তার কোনো ধাপ দুর্বল হলে তা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ‘ব্যক্তি’ নয়, ‘ঝুঁকি’ বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সাধারণ যাত্রীর ব্যাগ যে মানদণ্ডে স্ক্যান করা হয়, গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীর ব্যাগও একই মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হবে। ভিআইপি প্রটোকল কখনোই সিকিউরিটি প্রটোকলের বিকল্প হতে পারে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা আরও কঠোর হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী যাত্রীদের জন্য নিরাপত্তা বিধি শিথিল করার সুযোগ থাকার কথা নয়। যদি কোনো পর্যায়ে এমন ব্যতিক্রমের সুযোগ তৈরি হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বিমানবন্দর নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি।

এদিকে একাধিক সংস্থা ও বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ৩১ রাউন্ড গোলাবারুদ বিমানে উঠল সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অথচ এর আগেই চলতি বছরে শাহজালালসহ দেশের সব বিমানবন্দরে কয়েক দফায় নিরাপত্তা ঝুঁকি সতর্কতা জারি করা হয়। তা সত্ত্বেও এতবড় ঘটনা প্রমাণ করে সবই যেন ‘বজ আঁটুনি ফসকা গেরো।’