Image description

দেশের গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতিটি সংসদীয় আসনের গ্রামীণ সড়ক, কালভার্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রেখে একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

এলজিইডি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের ২৭৯টি সংসদীয় আসনের প্রতিটির জন্য ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হবে। প্রতিবছর আসনপ্রতি ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে মোট ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।

তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত মোট ২১টি সংসদীয় আসনের জন্য এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বরাদ্দের অর্থ দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, ছোট কালভার্ট নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রকল্পের আওতায় কাজ নেওয়া হবে। পুরো প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে দেশের আট বিভাগের জন্য পৃথক আটটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও অগ্রগতি মূল্যায়ন সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এরই মধ্যে আট বিভাগের জন্য আটজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বরিশাল বিভাগের প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বরিশাল বিভাগের ২১টি উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা ও ছোট কালভার্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করা হবে।’

তিনি জানান, প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবটি সংশোধন ও পর্যালোচনার পর একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে।

কৃষিপণ্য পরিবহনে মিলবে সুফল : কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদ অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন বলেন, দেশের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বড় অংশই গ্রামাঞ্চল থেকে আসে। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অনেক সময় কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য যথাসময়ে বড় বাজার বা জেলা সদরে নিতে পারেন না।

তিনি বলেন, বিশেষ করে পচনশীল কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নিতে না পারলে গুণগত মান নষ্ট হয়। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ভালো সড়ক যোগাযোগ তৈরি হলে উৎপাদন এলাকা থেকে পণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষকের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

এলজিইডি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের প্রতিটি কাজের ব্যয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে প্রচলিত

সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করা হবে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি ব্যয়ের কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অতীতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ রয়েছে। বরাদ্দের অর্থ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয় এবং কাজের মান নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়েও নজর দেওয়া হবে।

নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাস্তার নামে বরাদ্দ দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, আগের দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় থেকে বের হয়ে এসে এবার সঠিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যেন জনগণের কাজে লাগে, সেটি নিশ্চিত করা হবে।

রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতি পাবে।

বদলে যাবে গ্রামীণ যোগাযোগের চিত্র : এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক রয়েছে। এসব সড়কের অনেকগুলোর সংস্কার ও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সড়ক ও ছোট কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হলে গ্রাম থেকে উপজেলা ও জেলা সদরে যাতায়াত সহজ হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে। এর সুফল শুধু যাতায়াতের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাতকরণ, স্থানীয় ব্যবসা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর
প্রভাব পড়বে।