চট্টগ্রাম ওয়াসায় আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ১ হাজার লিটার পানির জন্য দাম দিতে হয় ১৮ টাকা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে যা ৩৭ টাকা। ২০০৯ সালে আবাসিক গ্রাহকদের দিতে হতো ৫ টাকা ৪১ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ১৫ টাকা ৩২ পয়সা। এই এক দশকে চারবার পানির দাম বাড়িয়েছে ওয়াসা। এর মধ্যে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এক লাফে দাম বাড়ানো হয়েছিল ৩৮ শতাংশ। সবশেষ গত ১ আগস্ট ওয়াসার বোর্ড সভায় পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব ওঠে। এটি পাস হলে আরও বেশি দামে পানি কিনতে হবে চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের।
কেন দফায় দফায় বাড়ছে এই দাম, তার খোঁজে জানা গেল, নগরের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এসব ঋণে বাস্তবায়ন হচ্ছে ১২টি মেগা প্রকল্প। আর শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ওয়াসার এক লাখ গ্রাহককেই চুকাতে হবে বিশাল এই ঋণের দায়। যার ৯৩ শতাংশই সাধারণ আবাসিক গ্রাহক।
পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কয়েক বছর পরপর দাম বাড়ালেও সংস্থাটির ‘সিস্টেম লস’ কমাতে তেমন কোনো তৎপরতা নেই। খোদ ওয়াসার নথি অনুযায়ী, তাদের সিস্টেম লস প্রায় ২০ শতাংশ।
এসব বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলমের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ওয়াসার যে বিশাল ঋণের বোঝা, তা সরকারের সহায়তা ছাড়া শোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া সিস্টেম লস কমাতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
পানি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. খায়রুল ইসলাম বলছিলেন, ‘ওয়াসা সিস্টেম লস এক অঙ্কে নামিয়ে আনুক। এরপর গণশুনানির মাধ্যমে দাম বাড়াতে পারে। সিস্টেম লস না কমিয়ে দাম বাড়ানো অযৌক্তিক।’ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশন গঠনেরও সুপারিশ তার।
১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ: চট্টগ্রাম ওয়াসার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, বর্তমানে সংস্থাটির ঘাড়ে ঝুলছে ৬ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। নয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ও বিদেশি সাহায্য সংস্থার কাছ থেকে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর ওপর চলমান তিন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও ৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা ঋণ শোধ করতে হবে। এর মধ্যে ফ্রান্সের উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা এএফডিকে ১ হাজার ৮৭২ কোটি ১৩ লাখ, বিশ্বব্যাংককে ৩ হাজার ২৬৮ কোটি ৭২ লাখ ও জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকাকে ৪ হাজার ১৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এ হিসাবে ওয়াসার মোট ঋণের দায় প্রায় ১৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।
পাঁচ বছরে পরিশোধ মাত্র ৮৯ কোটি: ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে তিনটি প্রকল্পের ঋণ শোধ করতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত শোধ হয়েছে মাত্র ৮৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। গড়ে প্রতি বছর ২২ কোটি টাকা করে শোধ করছে তারা।
অন্যদিকে গত অর্থবছরে ওয়াসা আয় করেছে ৩৩৭ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩০২ কোটি টাকা। ফলে নিজস্ব আয়ে ঋণ পরিশোধ দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ সামাল দিতে সংস্থাটির রাজস্ব বিভাগ থেকে পানির দাম নতুন করে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষকে কেন টাকা দিয়ে পানি কিনতে হবে— সে প্রশ্ন রাখলেন সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস পপি। তিনি বলছিলেন, ‘মৌলিক এই অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিচ্ছি। সরকারের উচিত ওয়াসাকে ভর্তুকি দেওয়া। আর ওয়াসার উচিত পানি চুরি ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ঠেকানো।’
৪% সিস্টেম লস কমালে বাড়াতে হবে না পানির দাম: ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে ১৮ হাজার ১৮১ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। এই পানি উৎপাদনে ব্যয় হয়েছিল ২৫১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রতি হাজার লিটারে ১৩ টাকা। তবে পরিচালন ব্যয় যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৩০০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি হাজার লিটারে পরিচালন ব্যয়সহ মোট খরচ সাড়ে ১৬ টাকা।
উৎপাদিত পানির ১৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ বা ৩ হাজার ৫৯৭ কোটি লিটার পানিই ‘সিস্টেম লস’-এ হাওয়া হয়ে যায়। এর ফলে প্রতি হাজার লিটার পানি উৎপাদনের পেছনে ওয়াসার খরচ ঠেকে ২১ টাকায়। এ হিসাবে ওয়াসা প্রতি হাজার লিটারে আবাসিকে লোকসান দিচ্ছে ৩ টাকা। বাণিজ্যিকে মুনাফা করছে ১৬ টাকা। সব মিলিয়ে সিস্টেম লসে ওয়াসার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি ৬৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড (দৈনিক জনপ্রতি ১০০ লিটার) অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিদিন গড়ে ৯ কোটি ৮৬ লাখ লিটার পানি সিস্টেমে নষ্ট করছে। সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারলে ওই একই পরিমাণ পানি দিয়ে চট্টগ্রাম নগরের আরও প্রায় ৯ লাখ ৮৬ হাজার নাগরিককে অনায়াসে নিরবচ্ছিন্ন সুপেয় পানির আওতায় আনা সম্ভব।
পানি বিক্রি থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসার গত অর্থবছরে আয় ২৯৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হলে সংস্থাটির বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩০৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকায়। ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ সিস্টেম লস কমালে দাম না বাড়িয়েও এই টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হতে পারে ওয়াসার।
তিন কারণে বাড়ে সিস্টেম লস: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন খাতের গবেষণা প্রতিবেদন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সিস্টেম লস (অপচয় হওয়া পানি) হ্রাসের চ্যালেঞ্জ’-এ আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ বিল কিংডম, রোল্যান্ড লিয়ামবার্জার এবং ফিলিপ মারিন উল্লেখ করেছেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও অবৈধ সংযোগের সুযোগ, অবকাঠামোগত মেরামত বা লিকেজ বন্ধ করার চেয়ে নতুন শোধনাগার উদ্বোধন করে ফিতা কাটার রাজনৈতিক প্রবণতা এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক কাজের মূল্যায়ন না থাকাই এই বিপুল পরিমাণ সিস্টেম লসের মূল কারণ।’
২০১০ সালের জুলাইয়ে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনকে মৌলিক মানবাধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। মানদণ্ড অনুযায়ী, জীবনধারণ ও গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রতি জনের দৈনিক অন্তত ৫০ থেকে ১০০ লিটার নিরাপদ পানি পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ওয়াটার-রাইটস নেটওয়ার্ক ‘ব্লু প্ল্যানেট প্রজেক্ট’ এবং ‘ফুড অ্যান্ড ওয়াটার ওয়াচ’-এর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো দীর্ঘদিন ধরে পানি সরবরাহের মতো প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবাকে বাণিজ্যিকীকরণের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে, সেবা সংস্থাগুলোর আর্থিক ঘাটতি মেটাতে বা মুনাফা বাড়াতে গ্রাহকের ওপর বারবার অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না চাপিয়ে টেকসই ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
প্রতিবেশীদের পানির দাম কেমন: আঞ্চলিক পর্যায়ে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোয় পানির দাম ঘন ঘন বাড়ানোর প্রবণতা নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য পানির পরিষেবা কার্যত শুল্কমুক্ত বা ভর্তুকিযুক্ত রাখা হয়। তবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে মিটারভিত্তিক রাজস্ব আদায় হয়। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে মেট্রোপলিটন ওয়াটার ওয়ার্কস অথরিটি ১৯৯৯ সালের পর গত ২৫ বছরে পানির দাম বাড়ায়নি। সেখানে প্রতি হাজার লিটারে ধার্য করা হয় সাড়ে ৮ বাথ। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৮ থেকে ৩০ টাকা। নেপালের কাঠমান্ডুতে ২০১৩ সালের পর ট্যারিফ বাড়ায়নি। যেখানে ১০ হাজার লিটারের ন্যূনতম বিল ১০০ নেপালি রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮১ টাকা। প্রতি হাজার লিটারের দাম মাত্র ৮ টাকা। দেশের মধ্যে ঢাকা ওয়াসায় আবাসিকে প্রতি হাজার লিটার পানির দাম ১৬ টাকা ৭০ পয়সা ও বাণিজ্যিকে ৪৬ টাকা ২০ পয়সা। ঢাকা ওয়াসা সবশেষ দাম বাড়িয়েছিল ২০২৪ সালের ১ জুলাই।