Image description

উত্তরের দুই বিভাগ রাজশাহী ও রংপুরে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকবে নাকি বগুড়ায় যাবে, এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে মন্ত্রিসভার দুই সদস্যের প্রকাশ্য অবস্থান-রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

এদের কেউ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নন। তারপরও নিজেদের জেলায় এই কার্যালয় নিশ্চিত করার দৌড়ে অংশ নিয়েছেন। আবার দুই নেতা যেসব বক্তব্য রাখছেন, তাতে পরস্পরের প্রতি আক্রমণ যেমন ফুটে উঠছে, তেমনি আঞ্চলিকতার বিষয়টি অর্থনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই সমালোচনা আছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চাইছেন প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় যাক। তিনি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি পত্র-ডিও লেটার দিয়েছেন। তাতে দাবি করা হয়েছে, বগুড়ায় প্রধান কার্যালয় গেলে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে।

তবে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু পাল্টা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাজশাহীর প্রতিষ্ঠান রাজশাহীতেই থাকবে। নেসকো কেন, কোনো কিছুই রাজশাহী থেকে যাবে না।

তিনি প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের লাভ-লোকসানের বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই বলছেন না। তিনি দেখছেন রাজশাহীর ‘স্বার্থ’।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খানের কাছে দুই মন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত রেষারেষির বিষয়টি ভালো লাগছে না। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের বাস্তব প্রয়োজন থাকলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই আঞ্চলিকতা বা রাজনৈতিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ, এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত।’

 

ব্যক্তিগত আক্রমণ

গত বুধবার সকালে রাজশাহীতে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মিনুর কথায় গুরুত্ব পায় নেসকো প্রসঙ্গ।

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে কটাক্ষ করে মিনু বলেন, ‘কোন কন্ট্রাক্টর (ঠিকাদার) কোথায় কী বলল, তাতে কিছু যায় আসে না। নেসকো কেন, রাজশাহীর কোনো প্রতিষ্ঠান কোথাও যাবে না।’

তার কাছে রাজশাহীই প্রথম জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে মন্ত্রিত্ব, এমপি বা মেয়রের পদ বড় নয়। এই মাটিতেই আমার জন্ম, এই মাটিতেই আমার মৃত্যু হবে। আল্লাহ আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন।’

এর আগে শাহে আলম এই প্রসঙ্গে কথা বলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর মানুষ সারাদিন চিৎকার করে। কোথায় রাজশাহী, কোথায় পঞ্চগড় পর্যন্ত এই বিদ্যুৎ সার্ভিস। আপনাদের এত ব্যথা লাগে কেন? ব্যথা লাগাবেন না ভাই। হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।’

কথাবার্তা ‘রাজনৈতিক’

ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রভাবশালী নেতার এমন বিপরীতমুখী অবস্থান নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমায় রাখেনি; বরং এটি এখন উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

রাজশাহীতে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী মহলে প্রশ্ন ওঠে—উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কী?

অন্যদিকে, মিনুর বক্তব্য নিয়েও বগুড়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সমর্থকরা গত ২৩ জুলাই বগুড়া শহরের সাতমাথা এলাকায় সর্বস্তরের মানুষের ব্যানারে মানববন্ধন করেন।

শাহে আলম টাইমসের প্রশ্নে স্বীকার করেছেন, নেসকো স্থানান্তর নিয়ে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় তো এভাবে সিদ্ধান্ত নেবে না। ওরা সুবিধা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।

এ নিয়ে কথা বেশি বাড়াতেও চাননি তিনি। ‘এটা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। ওরা সিদ্ধান্ত দেবে। এখানে আমরা কথা না বলাই ভালো’, বলেন তিনি।

ডিও দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়া যেহেতু মধ্যস্থল। পঞ্চগড় ও রংপুরের মানুষকে প্রধান কার্যালয়ে যেতে হলে রাজশাহীতে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে হয়। সেজন্য আমি প্রস্তাব করেছি।’

অন্যদিকে, মিনু কোনো বিশ্লেষণেই যেতে চান না। তিনি নেসকোকে রাজশাহীর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখছেন।

বিবেচনায় থাকা উচিত অর্থনীতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান টাইমসকে বলেন, ‘নেসকো এলাকার গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সেবা নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ নেই। সুতরাং বিষয়টি আবেগ বা আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, অর্থনৈতিক ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’

‘একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করতে হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব ও ব্যয় বহনের সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। বর্তমান বাস্তবতায় সেই সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, তা আগে মূল্যায়ন করা উচিত,’ বলেন তিনি।

এর আগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় বগুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিভাগে একটি করে এ ধরনের কার্যালয় থাকলেও রাজশাহী বিভাগের ক্ষেত্রে কার্যত দুটি কার্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, এটি রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ।

প্রধান কার্যালয় কোথায় থাকার কথা

২০১৬ সালে নেসকো প্রতিষ্ঠার সময়ই কর্তৃপক্ষ প্রথমে প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেখানে প্রধান কার্যালয় করার মতো জমিও অধিগ্রহণ করে রাখা আছে। এই সিদ্ধান্তের কারণ ছিল, এটি রাজশাহী ও রংপুরের মাঝামাঝি একটি কৌশলগত অবস্থান। তবে সাময়িকভাবে রাজশাহী থেকে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্তই প্রায় এক দশক ধরে স্থায়ী হয়ে যায়।

বিএনপি সরকারে আসার পর সেই আলোচনা নতুন গতি পায়। পরে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ডিও লেটার দেওয়ার পর এক মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিও তার পক্ষেই বলেছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিশেষ করে সিস্টেম লস (নেট লস) এবং বকেয়া বিল আদায়ের ক্ষেত্রে রংপুর অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে তদারকির জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।’

গত ৩ এপ্রিল কমিটি বগুড়া সদর উপজেলার পুরোনো বগুড়া পাওয়ার ভবনের পাশে ৫১ দশমিক ৫৯ একর জমি পরিদর্শন করে। সেখানে রয়েছে ৭ দশমিক ৫ একর বিদ্যুৎ গ্রিড এলাকা, ৭,০০২ বর্গফুট আয়তনের তিনতলা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়, সংস্কারযোগ্য একটি পুরোনো ভবন, দুটি দ্বিতল বিশ্রামাগার এবং দুটি আবাসিক ভবন। এসব স্থাপনা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয় স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট, পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্যও পর্যাপ্ত জমি অবশিষ্ট থাকবে।

এখানে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করা হলে রংপুর থেকে সদর দপ্তরের দূরত্ব ২১৮ কিলোমিটার থেকে কমে ১০৫ কিলোমিটারে নেমে আসবে। অন্যদিকে, রাজশাহী থেকে বগুড়ার দূরত্ব ১১৩ কিলোমিটার হওয়ায় এটি উভয় অঞ্চলের জন্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান হবে।

কমিটির মতে, বগুড়া রাজধানীর আরও কাছাকাছি এবং সড়ক যোগাযোগও অনেক উন্নত। ফলে মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সরকারি সমন্বয় আরও সহজ হবে।

কমিটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুর্বল তদারকি, জনবল সংকট এবং পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তার অভাবে রংপুর অঞ্চল রাজশাহী অঞ্চলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে যেতে পারেন না। একই সঙ্গে রংপুর অঞ্চলের কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের জন্য রাজশাহী যাতায়াতে অযথা সময়, শ্রম এবং ভ্রমণ ভাতা ব্যয় হয়।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মাঝামাঝি স্থানে নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হলে উভয় অঞ্চলে সমানভাবে তদারকি করা সম্ভব হবে। এর ফলে সিস্টেম লস কমবে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান নিজেও চান প্রধান কার্যালয় বগুড়াতেই যাক। তার মতে, রাজশাহী ও রংপুরের মধ্যকার দীর্ঘ দূরত্ব কার্যকর তদারকির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘বগুড়ায় স্থানান্তরিত হলে আমরা মাঠপর্যায়ের আরও কাছাকাছি যেতে পারব এবং ঢাকা যাতায়াতের দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার কমে যাবে, যা সরাসরি পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন জানান, প্রধান প্রকৌশলী, পরিকল্পনা বিভাগ এবং ডেটা সেন্টার রাজশাহীতেই থাকবে। কেবল করপোরেট অফিস—অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার নির্বাহী সহযোগীদের কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তর করা হবে। এতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হবে না।