১৯৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছিল আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। এসব আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংগঠন।
তবে তিন দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতাচর্চার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসেও একই ধরনের রূপান্তরের নজির রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অধিকারভিত্তিক আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলো সামনের সারিতে ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে তারা মূল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের চেয়ে দলীয় রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন, ক্যাম্পাসে প্রভাব বজায় রাখা এবং বিরোধী মত নিয়ন্ত্রণে বেশি সক্রিয় হয়েছে। ফলে ছাত্ররাজনীতির স্বাতন্ত্র্য ও প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আফ্রিকার স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাত্রসংগঠনগুলো কীভাবে পরবর্তী সময়ে শাসন ব্যবস্থার অধীনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা ও হাতিয়ারে পরিণত হলো সে বিষয়ে গবেষণা করেছিলেন নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পিএইচডি গবেষক আন্দ্রেয়া ক্রনস্টাড ফেল্ড। গবেষণাকার্যে তিনি উগান্ডার মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদকে (স্টুডেন্ট গিল্ড) কেস স্টাডি হিসেবে নিয়েছিলেন। ‘ওপেনিং দ্য ব্ল্যাক বক্স অব স্টুডেন্ট গভর্নমেন্ট ইন অথরিটারিয়ান কনটেক্সটস: ইনস্টিটিউশনাল ওয়ার্ক অ্যান্ড ইন্ট্রা-অর্গানাইজেশনাল কনফ্লিক্টস ইন দ্য স্টুডেন্টস গিল্ড অ্যাট মাকেরেরে ইউনিভার্সিটি, উগান্ডা’—শিরোনামের গবেষণাটি ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল স্প্রিঞ্জারের ‘হায়ার এডুকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় ফেল্ড দেখতে পান, ছাত্রসংগঠনগুলোর এ রূপান্তরের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা। আর্থিক নিরাপত্তার প্রত্যাশা, চাকরির প্রলোভন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রসংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে অনেক ছাত্রসংগঠন ক্রমেই রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফেল্ডের মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজনীতিকে এখন একটি লাভজনক ‘ব্যবসা’ হিসেবেও দেখা হয়। আর এসব সুযোগ-সুবিধাকে হাতিয়ার করেই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
আফ্রিকার দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বরাবরই সামনের সারিতে থেকেছে। তবে গত পাঁচ দশকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনে। ওই বছরের ১৫ জুলাই শাহবাগে সমাবেশ করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সেই সমাবেশে হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
অথচ এ ছাত্রসংগঠন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই ধীরে ধীরে এ চিত্র বদলাতে শুরু করে। সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে ক্রমেই আওয়ামী লীগের দলীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন বিভিন্ন সময়ে সরকার ও দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, বিভিন্ন পর্যায়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা এবং ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলো এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালায়।
ক্ষমতাসীন দলের এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি প্রযোজ্য বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব দলের ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক, কোচিং সেন্টার, শিক্ষা বা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ও প্রভাব রয়েছে, সেসব দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পরিবার থেকে আসেন। তাদের কাছে ভবিষ্যতের চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মতাদর্শের চেয়ে আর্থিক প্রণোদনা বা ভবিষ্যৎ সুবিধার হিসাবই নির্ধারণ করে দেয় একজন শিক্ষার্থী কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন।’
তানজীমউদ্দিন খান আরো বলেন, ‘নব্বই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের আরো একটি বড় কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বদলে বড় দলগুলোতে নেটওয়ার্কিং, লবিং এবং শীর্ষ নেতৃত্বের আনুকূল্যই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যোগ্যতার চেয়ে নেতৃত্বের প্রতি তোষামোদ ও আনুগত্য প্রদর্শনই পদ পাওয়ার কিংবা পদ ধরে রাখার প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়ায়।’
রাজনৈতিক নেতৃত্বে আনুগত্যের এ সংস্কৃতি শুধু সাংগঠনিক পদ-পদবিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের চাকরি ও পেশাগত সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। পুলিশের সার্জেন্ট পদে ছয় ছাত্রলীগ নেতা এবং রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রলীগ নেতাকে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এসব সুপারিশে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র ব্যবহার করেছিলেন। দুটি ডিও লেটার ইস্যু করা হয় যথাক্রমে ২০২৩ সালের ১০ ও ৫ এপ্রিল। ওই সময় তিনি শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে বিপুলসংখ্যক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অগ্রাধিকার পেয়েছেন। বিশেষ করে পুলিশ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ বারবার উঠেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ওই ১৫ বছরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শুধু শিক্ষক হিসেবেই নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৮০০ জন। এসব নিয়োগের একটি বড় অংশে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হিসেবে দেখা হতো—এমন অভিযোগও রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেয়ার পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিতে দেখা গেছে।
এ ধরনের অভিযোগ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও উঠেছিল। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে অনুসন্ধান কাম-তথ্য কর্মকর্তা পদে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পান রাশেদুল ইসলাম। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কয়েকজন সমন্বয়কের প্রভাব ছিল। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারে সহকারী প্রোগ্রামার হিসেবে নিয়োগ পান মোমেন খন্দকার নামের এক শিক্ষার্থী। তার ক্ষেত্রেও স্নাতকের ফল প্রকাশের আগেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ ওঠে।
নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার গঠনের পরও কিছু নিয়োগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত ২১ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন ছাত্রদল নেতাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। তারা হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সহসভাপতি মেহেদী হাসান আবির এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান রাকিব। এর মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা), মেহেদী হাসান আবির মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে এবং রাকিবুল হাসান রাকিব এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোতে নিয়োগ পেয়েছেন।
দেশের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথম দিকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মূলত হলে একটি সিট পাওয়ার জন্য কিংবা সিনিয়রদের র্যাগিং ও হয়রানি থেকে বাঁচতে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আরো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কাছে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে একটি ভালো চাকরিসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। এ প্রত্যাশা থেকেই অনেকে ধীরে ধীরে এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যেগুলো অন্যায় বা অনৈতিক হলেও দলীয় আনুগত্যের কারণে তারা সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংগঠনে প্রভাব ধরে রাখতে চা-নাশতা, মিছিল-সমাবেশ, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। যা একজন শিক্ষার্থী বা ছাত্রনেতার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে মূল দলের কোনো প্রভাবশালী নেতার অনুগত হওয়া এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে সেই নেতাদের কাছ থেকেই এ ধরনের অর্থের জোগান পাওয়া যায়। এটিও লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির একটি বড় কারণ।’
এ বক্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া যায় গত দেড় দশকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নামে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনে জমে থাকা বকেয়া বিলের তথ্যেও। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক মো. মাসুদ জানিয়েছিলেন, আগের তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাফেটেরিয়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকার খাবার বাকিতে খেয়েছেন। এর মধ্যে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজির নামে ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং সাধারণ সম্পাদক এসএম আকতার হোসাইনের নামে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বকেয়া ছিল।
এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বকেয়া অর্থ পরিশোধের আহ্বান জানিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিন পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তার দাবি ছিল, ২০১০ সালে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তার কাছ থেকে প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকার খাবার বাকিতে খেয়েছেন, যার বড় একটি অংশই আর পরিশোধ করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বকেয়ার সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একসময় ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল। এসব সংগঠনই বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিত। ধীরে ধীরে ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। তারা যখন জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন ছাত্রসংগঠনগুলোরও নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে ছাত্রসংগঠনগুলো মূল রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত থাকছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা চাকরির সুবিধার মতো বিষয় কিছু ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে এটিকেই প্রধান কারণ বলা ঠিক হবে না। কারণ ক্ষমতার বাইরে থাকা কিংবা ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনও একইভাবে নিজ নিজ মাদার অর্গানাইজেশনের এজেন্ডা অনুসরণ করছে।’
মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, সমস্যাটি শুধু আর্থিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গত তিন দশকে দেশের সামগ্রিক রাজনীতির কাঠামোগত ধরন এমনভাবে গড়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কর্তৃত্ব এতটাই প্রবল হয়েছে যে অন্যান্য সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের মতো ছাত্রসংগঠনগুলোর স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়েছে। তারা মাঝেমধ্যে কিছু বিষয়ে প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত মূল রাজনৈতিক দলের দেয়া নির্দেশনা মেনেই চলতে বাধ্য হচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতির বর্তমান দুরবস্থাকে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামোর ফল বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক ভিপি ও সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী কাঠামো গড়ে উঠেছে। এ কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সরকারগুলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত করে প্রতিবাদের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ফলে ছাত্রসংগঠনগুলো গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে কাজ করার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষাঙ্গনে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, সেটি এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও রাষ্ট্রকে তারা যে কাঠামোয় রেখে গিয়েছিল, সেটি এখনো অনেকটাই বহাল রয়েছে।’
মূল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে অন্ধ অনুকরণের সংস্কৃতি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির চর্চায় আছে—এটি অস্বীকারের সুযোগ নেই বলে মনে করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক (সেক্রেটারি জেনারেল) সিবগাতুল্লাহ সিবগা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে ছাত্রলীগের যেসব কর্মকাণ্ড আমরা দেখেছি সেটি ছিল ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ সময়ে চাকরির প্রলোভন, আর্থিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে দল ভারী করা এবং তাদের দলীয় স্বার্থ হাসিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারও অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চাকরি বা আর্থিক সুবিধার বিষয়টি শুধু ছাত্রলীগ নয়, যারাই সরকারি ক্ষমতায় থাকে তাদের ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও অতীতে এটি দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশ ছাত্রশিবির এ ধরনের চর্চা করে না। আমরা যেহেতু কখনো ক্ষমতায় যাইনি তাই এ ধরনের অভিযোগেরও সুযোগ নেই।’
ছাত্রলীগের কারণে বিগত ১৭ বছরে ছাত্ররাজনীতি চরম লেজুড়বৃত্তিক ও নির্যাতনমূলক রূপ নিয়েছিল বলে মনে করেন বাংলাদেশ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ক্যারিয়ারের সুযোগ-সুবিধাকে পুঁজি করে ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহারের প্রবণতা আমরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেখেছি। তবে ছাত্রদলের রাজনীতিতে এর স্থান অতীতেও ছিল না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর নিপীড়নমূলক ছাত্ররাজনীতি প্রায় সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শিক জায়গা থেকে ছাত্রসংগঠনগুলো মূল সংগঠনের আদর্শ ধারণ করলেও সবাই ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান রয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে প্রকাশ্য রাজনীতির বিপরীতে ছাত্রশিবিরের সংগঠনের গুপ্ত রাজনীতির সংস্কৃতি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।’