Image description
বিচার দ্রুত শেষ না হওয়ায় বেড়েই চলেছে বন্দি

দেশে মোট ৭৫টি কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ২৮৬ জন, অথচ গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত কারাগারগুলোতে বন্দি ছিল ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি বন্দির ভার বহন করছে দেশের কারাগারগুলো। আর ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি ব্যবস্থাপনায়ও হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে মিলেছে এ তথ্য।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কারা-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান এবং নানা কারণে আটক-গ্রেপ্তার বেড়ে গেলে কারাগারে বন্দির সংখ্যাও বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণঅভ্যুত্থান দমনে হত্যা-হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মামলা ও আসামির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কারাগারে বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বা দ্বিগুণ বন্দি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বন্দিদের স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও বাসস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বন্দিদের জন্য ঘোষিত অধিকারও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চললেও পরিস্থিতি সামলাতে নতুন পরিকল্পনাও নেই।

কারা সূত্র বলছে, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের দিন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে কারাগারগুলোতে বন্দি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার। এর এক সপ্তাহের মধ্যে বন্দির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৯ হাজারে। যদিও বছর শেষে তা ৬০ হাজারের মতো হয়। অবশ্য গত বছরের জুলাই পর্যন্ত এই বন্দির সংখ্যা ছিল ৭৭ হাজার ২৯১ জন। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বন্দির সংখ্যা ৯৩ হাজার ৪৪০ জন।

কারা সূত্রে পাওয়া ৩০ জুলাই পর্যন্ত পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, কারাগারগুলোতে মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ২৮৬ জন, যেখানে পুরুষ বন্দির ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ২৫৭ জন এবং মহিলা বন্দির ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯ জন। তবে ওই সময় পর্যন্ত কারাগারে ৮৯ হাজার ৯২৯ জন পুরুষ ও ৩ হাজার ৫১১ জন নারী বন্দিসহ মোট ৯৩ হাজার ৪৪০ জন বন্দি ছিলেন। এই মোট বন্দিদের মধ্যে কয়েদি বা দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি মাত্র ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। এ ছাড়া ফাঁসির দণ্ড পাওয়া বন্দি দুই হাজার ৫৮০ জন, যাদের মধ্যে নারী ৭৬ জন।

কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, সারা দেশে কারাগারগুলোতে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৭০০ নতুন বন্দি আনা হয়। তবে জামিনে বা সাজা খেটে প্রতিদিনই গড়ে দুই হাজার ৬৮৭ জন বন্দি রিলিজ হয়।

কারা অধিদপ্তরের সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা বিভাগে কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরের কাশিমপুর মিলিয়ে ছয়টি কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশে ঘোষিত মোট ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে। এই কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের প্রায় সব কারাগারেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যক বন্দি রয়েছেন। দেশের উল্লেখযোগ্য কারাগারগুলোর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জে ধারণক্ষমতা চার হাজার ৫৯০ জন। তবে জুলাই পর্যন্ত ওই কারাগারে বন্দি ছিল ১২ হাজার ৫৯ জন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ধারণক্ষমতা-৫৪৮ জন হলেও সেখানে বন্দি এক হাজার ৭৬৩ জন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ধারণক্ষমতা-২ হাজারের মতো হলেও বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় চার হাজারজন। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের ধারণক্ষমতা ১০০০ জনের হলেও সেখানে প্রায় তিন হাজার বন্দি রয়েছেন।

কারাগারের একজন কর্মকর্তা বলেন, কারাগারে বন্দিদের মধ্যে মাদক মামলার বন্দি বেশি। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত কারাগারগুলোতে মাদক মামলায় অন্তত ১৮ হাজারের মতো বন্দি রয়েছেন।

কারাগার সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের হত্যা মামলায় ৪৬৫ জন এবং হত্যাচেষ্টা মামলায় ৩৭১ জন বন্দি রয়েছেন। এ ছাড়াও চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৪১৪ জন এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ৬৮ জন বন্দি রয়েছেন।

ওই সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আমলের ৪৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ৭৬ এমপি, ৫৩ পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮ আমলা বন্দি রয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, আমাদের দেশের কারাগারগুলোতে সবসময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকায় আরও বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কারাগার তৈরি করা উচিত। কিন্তু এটা আসলে কোনো সভ্য দেশের নিদর্শন হতে পারে না। বরং কারাগার যত কম হবে, একটা দেশ ততই এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে আসামি এবং বন্দির সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়াও রাজনৈতিক মামলা এবং গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ার কারণে এই সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন কালবেলাকে বলেন, কারাগারের এই ধারণক্ষমতাটা বাসস্থান, চলাফেরা, চিকিৎসা, খাদ্যসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো হিসাব-নিকাশ করে করা হয়। এখন সেই ধারণক্ষমতার বেশি বা দ্বিগুণ বন্দি যদি থাকে, তাহলে সব ক্ষেত্রেই চাপ পড়বে এবং বন্দির অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।

তিনি বলেন, কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকলে মানসম্পন্ন খাবারে চাপ পড়বে, বন্দির চলাফেরা সংকুচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এর প্রভাব পড়ে শরীরে। এতে দেখা যায়, বন্দিরা পেটের পীড়া, চুলকানি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো রোগে ভোগেন। সব মিলিয়ে বন্দির অধিকার খর্ব হয়।

এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, তা ছাড়া কারাগারের যে জনবল রয়েছে, তা তো বন্দি ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই দেওয়া হয়। এখন সেখানে যদি বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে বন্দিদের দেখভাল করার যে বিষয়টা, সেটা সংকুচিত হয়ে যায়।

কারা অধিদপ্তরের সাবেক ডিআইজি মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী কালবেলাকে বলেন, কারাগারগুলোতে সব সময়েই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা থাকলে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি ব্যবস্থাপনা করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বর্তমান আইজি প্রিজন্স সেটা আন্তরিকভাবেই সামাল দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ না হওয়ায় কারাগারে কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দি বেশি থাকেন। এজন্য বিচারের গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

কারাগারে কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দি দ্বিগুণ: বন্দিদের মধ্যে যাদের মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়ে আদালতের মাধ্যমে দণ্ড পেয়েছেন, তাদের কয়েদি বলা হয়। অপরদিকে যেসব মামলার আসামিদের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে, তারা হাজতি হিসেবে পরিচিত। তবে কারাগারের পরিসংখ্যান বলছে, ৯৩ হাজার ৪৪০ বন্দির মধ্যে এখন কয়েদি রয়েছে ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। অর্থাৎ ৬৩ হাজারের মতো বন্দি রয়েছেন, যাদের বিচার কার্যক্রম চলমান।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, সব সময়েই কারাগারগুলোতে কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দির সংখ্যা বেশি থাকছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে থাকা প্রায় ৮০ হাজার বন্দির মধ্যে ৭৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ছিল হাজতি। এর আগের বছর কারাগারগুলোতে বিচারাধীন বন্দি (হাজতি) ছিলেন অন্তত ৫৫ হাজার। ২০২৩ সালে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৫৭ হাজার হাজতি ছিলেন, যা মোট ওই বছরের মোট বন্দির ৭৪ শতাংশ।

সাবেক ডিআইজি (প্রিজন্স) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী কালবেলাকে বলেন, খুনের মামলায় কারও যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তা কার্যকর করতে হয়তো অল্প সময় লাগে। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে বছরের পর বছর হাজতি হিসেবেই কারাগারে থাকতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে কোনো কারাগারের অন্তত ৩০ ভাগ কয়েদি থাকলে সেই কারাগারের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ভালো থাকে। কারণ দণ্ডপ্রাপ্ত এই বন্দিরাই কারাগারে পরিচ্ছন্নতাসহ নানা ধরনের কাজ করে থাকেন। এখন কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দি বেশি হয়ে গেলে কারাগারের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন।

এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, কারাগারগুলোতে বন্দির চাপ কমাতে কম গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো গ্রাম আদালত তৈরি করে বা শহরে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। তবে চলমান মামলাগুলোর বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। যথাযথ সময়ে বিচার কার্যক্রম শেষ করতে পারলে কারাগারে বন্দির সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।