Image description

গত ২৭ এপ্রিল দুই পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদ ও দেলওয়ার হোসেনের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হলেও মামলার প্রভাবশালী আসামিদের অনেকেই এখনো গ্রেপ্তার হননি।

বরং তারা প্রকাশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এমনকি হত্যা মামলার আসামি হয়েও পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সভায় অংশ নেওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেল ৪টায় নগরীর উপশহরে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার কার্যালয়ে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বাসের হেলপার রিপন হত্যা মামলার প্রধান আসামি, সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম এবং এজাহারভুক্ত দ্বিতীয় আসামি আলী আকবর রাজন।

অভিযোগ রয়েছে, হত্যা মামলা ছাড়াও ময়নুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শাহপরান থানায় দায়ের করা ছাত্রদলকর্মী হত্যা মামলার আসামি রুনু মিয়া মঈন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত পরিবহন মালিক সমিতির নেতা আবেদ সুলতান চৌধুরী তারেক ওরফে তারেক চৌধুরী।

এ ছাড়া বিআরটিএর চিহ্নিত দালালির অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন পরিবহন নেতাকেও সভায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। সভা শেষে তারা পুলিশ কমিশনারকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এর আগেও গত ৫ জুলাই সদ্য বিদায়ী পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে হত্যা মামলার আসামিদের উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। সবশেষ সমন্বয় সভায় তাদের অংশগ্রহণের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বাংলানিউজকে বলেন, ‘হত্যা মামলার আসামিদের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা কিংবা পুলিশ কমিশনারের কোনো সভায় আমন্ত্রণ জানানো উচিত নয়, যতদিন পর্যন্ত তারা আদালত থেকে খালাস না পান। কোনো মামলায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও আদালত তা গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা এ ধরনের সভায় আমন্ত্রণ পাওয়ার সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘দাওয়াতের বিষয়টি আমি জানি না। এটি ট্রাফিক বিভাগ থেকে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।’

এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সদর ও প্রশাসন) দপ্তর। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

তবে তিনি জানান, হত্যা মামলায় শ্রমিক নেতা ময়নুল ইসলামসহ কয়েকজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

আদালত সেই অব্যাহতির আবেদন গ্রহণের আগে তারা এ ধরনের সভায় অংশ নিতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’

বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় এসএমপি সদর দপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।

সভার শুরুতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা পরিবহন খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। পুলিশ কমিশনার তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

তিনি মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ও সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

সভা শেষে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সদর ও প্রশাসন) মো. মাসুদ রানা (পিপিএম-সেবা), উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ, অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিবি) মো. আকতার হোসেন, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক, অতিরিক্ত দায়িত্বে সদর ও প্রশাসন) সুদীপ্ত রায়, উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর, অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিসি-প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) মো. আফজাল হোসেনসহ এসএমপির অন্যান্য কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে দক্ষিণ সুরমার কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সশস্ত্র হামলায় দুই পরিবহন শ্রমিক নিহত হন। হামলায় আরও কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। হামলাকারীরা সেদিন মালিক সমিতির কার্যালয়, বিভিন্ন বাস কাউন্টার এবং কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে।

গুরুতর আহত রিপন আহমদ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ মে মারা যান। পরে ৭ মে মারা যান বাসচালক দেলওয়ার হোসেন (৪০)।

নিহত রিপন আহমদ গোলাপগঞ্জ উপজেলার উত্তর রণকেলি গ্রামের সাবলু মিয়ার ছেলে। দেলওয়ার হোসেন ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই বাঘবাড়ি এলাকার আজির উদ্দিনের ছেলে।

ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে দক্ষিণ সুরমা থানায় পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। রিপন হত্যা মামলায় সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক) আলী আকবর রাজনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়।