Image description

টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। এ মামলায় তৎকালীন র‍্যাব-৭ অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের সেনা হেফাজতে যাওয়ার পর তার দায়িত্বকালীন ‘ক্রসফায়ার’ ঘটনাগুলো আবার আলোচনায় এসেছে।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত র‍্যাব-৭-এর অভিযানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনীতে অন্তত ১৪ জন নিহত হন। প্রায় সব ঘটনায় র‍্যাবের ভাষ্য ছিল, তারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। তবে নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, তাদের আগেই আটক করা হয়েছিল। পরে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করে ঘটনা সাজানো হয়।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ এলাকার মিঠাপানিতে মাদকবিরোধী অভিযানের কথা জানায় র‍্যাব। বাহিনীর দাবি ছিল, মাদক কারবারিদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। র‍্যাব তাকে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি বলেও দাবি করে।

কয়েকদিন পর একরামুলের পরিবারের সংরক্ষিত একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ্যে আসে। এতে পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথোপকথন, পরে গুলির শব্দ এবং তার কণ্ঠ শোনা যায়। অডিওটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ঘটনাটির তদন্তের দাবি জানায়। একরামুলের পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে, এটি কোনো বন্দুকযুদ্ধ ছিল না; তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আসছেন। তিনি বলেন, আট বছর ধরে তারা শুধু একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার বিচার চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের পর তিনি মনে করছেন, সত্য উদ্‌ঘাটনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আট বছর ধরে তিনি শুধু একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন, যেদিন তার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া সত্যিকার অর্থে শুরু হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একরামুল হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল এবং ঘটনার সময় র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে সেনা হেফাজতে নেওয়ার খবর তার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

একরামুল হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর শুধু এটিই নয়, নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত র‍্যাব-৭-এর অধীনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনীতে সংঘটিত কথিত অন্য ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনাগুলোও। ওই সময় র‍্যাব-৭-এর দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। তার দায়িত্বকালে অন্তত ১৪ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। অধিকাংশ ঘটনায় র‍্যাবের ভাষ্য ছিল একই ধরনের। তবে কয়েকটি ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল ভিন্ন। এখন একরামুল হত্যা মামলার আইনি অগ্রগতির পর প্রশ্ন উঠছে, একই সময়ের অন্য বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোর নথিও কি নতুন করে পর্যালোচনার আওতায় আসবে?

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, একরামুল হত্যা মামলায় আইনি অগ্রগতি শুধু একটি ঘটনার বিচার নয়, এটি একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচালিত অন্য কথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনাগুলো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন করা উচিত।

মিফতাহ উদ্দিন ছিলেন চট্টগ্রামের আতঙ্ক

২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ এলাকায় র‍্যাবের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইয়াকুব ও কামরুল। র‍্যাব জানায়, তারা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং আগে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একই বছরের ২৯ অক্টোবর মীরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর এলাকায় আরেকটি অভিযানে তিনজন নিহত হন। তাদের বিরুদ্ধেও ডাকাতির অভিযোগ আনে র‍্যাব। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই ফেনীর বিরিঞ্চি এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন রুটি সোহেল নামে পরিচিত মো. সোহেল। তিনি ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। একই বছরের ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামের সদরঘাটে নিহত হন বাইট্যা ফারুক নামে পরিচিত মোহাম্মদ ফারুক। র‍্যাব তাকে শীর্ষ ইয়াবা কারবারি দাবি করে।

২০১৮ সালের মে মাসে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও বাড়তে থাকে। ১৭ মে রাতে চট্টগ্রাম নগরের বরিশাল কলোনিতে র‍্যাবের অভিযানে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান ওরফে মোটা হাবিব এবং মোশাররফ নামে এক টেম্পোচালক। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, মোশাররফ র‍্যাবকে মোটা হাবিবের অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিলেন। পরে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে তাকেও হত্যা করা হয়।

২১ মে রাতে ফেনীর ধর্মপুরে নিহত হন আনোয়ার হোসেন। ২৬ মে টেকনাফে নিহত হন কাউন্সিলর একরামুল হক। ৩০ মে কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বরে নিহত হন মজিবুর রহমান। ১২ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে আরেকটি অভিযানে একজন সন্দেহভাজন মাদক কারবারি নিহত হন। ২০ নভেম্বর টেকনাফে র‍্যাবের অভিযানে আরো দুজন নিহত হন।

এখনো ছেলের অপেক্ষায় মা

২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর মুরাদপুরের ওই অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে সামনে আসে কর্ণফুলী উপজেলার ১৭ বছর বয়সি জাহিদ হাসানের নাম। পরিবারের দাবি, জাহিদ ওই অভিযানে ব্যবহৃত গাড়ির চালক ছিলেন এবং পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। অভিযানের দুই দিন পর কর্ণফুলী থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

জাহিদের মা হোসনে আরা বেগম বলেন, আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তাকে ধরে নেওয়ার পর আর ফেরত দেয়নি। র‍্যাব-৭-এর অফিসে বহুবার গেছি, প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছি। আট বছর ধরে জানি না আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে।

তার অভিযোগ, জাহিদকে গুম করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি।