অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ডুবতে বসেছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) আওতাধীন ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্কের (এনএইচএন) প্রতিষ্ঠানগুলো। বছরের পর বছর লোকসান হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এনএইচএনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. এম এ সামাদ এবং মিরপুর-১০ ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালের সাবেক পরিচালক চিকিৎসক মো. আতাউর রহমান সিন্ডিকেট গড়ে লুটপাটের মহোৎসব চালিয়েছেন। এ দুজনের নেতৃত্বে একটি দেউলিয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এনএইচএন।
এনএইচএনের সিইও ডা. এম এ সামাদ টানা ১৮ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০০৮ সালের ৮ মে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সিইও হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২০ সালে তার চুক্তিভিত্তিক চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। তিন বছরের জন্য আবারও চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত করা হয়। এ সময়ে তার মাসিক বেতন সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত ৩৭তম বোর্ড সভায় তার বেতন আরও বাড়িয়ে মাসিক সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের ৯ মে থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য চুক্তি নবায়নের সুপারিশ করা হয়। তিন বছরের ব্যবধানে তার বেতন কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়। তার বছরে বিদেশ ভ্রমণে ৩ লাখ টাকা এবং অন্যান্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে এনএইচএনের ফান্ড থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, সার্কুলার ছাড়া এনএইচএনে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ডা. সামাদ। ২০০৮ সালের পর থেকে এনএইচএনের প্রতিষ্ঠানগুলোয় যত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অর্ধেক হয়েছে তার সুপারিশে। ডা. সামাদের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন।
সামাদের যত সম্পদ: এনএইচএনে থেকে গত ১৮ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এম এ সামাদ। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বি-ব্লকের ৪৩২ নম্বর প্লটের তৃতীয় তলায় রয়েছে সাড়ে ১৪শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। যার বর্তমান মূল্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। খিলগাঁও তালতলা বি-ব্লকে আরেকটি ৩৪৫/৩-৫ নম্বর প্লটে তিন তলায় সাড়ে ১২শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় কোটি টাকা। এলিফ্যান্ট রোডের ২৫৯/১ প্লটেও ১৫শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট আছে তার। যার বাজার মূল্য দেড় কোটি টাকার কাছাকাছি। পূর্বাচল নিউ টাউনের ২৩ নম্বর সেক্টরের ৩০২ নম্বর রোডে রয়েছে তিন কাঠার প্লট। মাওয়া ও ৩০০ ফিটে পিংক সিটিতে প্লট আছে। গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর শহরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে গড়েছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি। স্ত্রীর নামে কিনেছেন প্রায় ৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। ছেলেমেয়ের বিদেশে চিকিৎসা বাবদও বিপুল টাকা ব্যয় করেছেন তিনি।
নিজের ও স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে কোটি টাকা। নামে-বেনামে আরও বিপুল সম্পদ গড়েছেন ডা. এম এ সামাদ। মাসিক সাড়ে ৪ লাখ টাকা বেতনে এত সম্পদের মালিক কীভাবে হলেন, এ বিষয়ে জানতে গত ২১ জুালাই মঙ্গলবার রাত ৮টায় যোগাযোগ করা হয় ডা. এম এ সামাদের সঙ্গে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘অফিস সময়ে ফোন দিয়ে আসবেন। দুদিন পর বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে তাকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি।
আতাউরের যত সম্পদ: সিইও ডা. এম এ সামাদের মতো ভাগ্য বদলেছে মিরপুর এনএইচএনের হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. আতাউর রহমানের। তার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া সি-ব্লকের ৬/৩ নম্বর প্লটে ফ্ল্যাট, লালবাটিয়া সি-ব্লকের ৭/৬ নম্বর প্লটে ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা রোড ৯-এর ৪৪ নম্বর প্লটে ফ্ল্যাট রয়েছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ডম-ইনোর কাছে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় প্লট নম্বর ৩১৮/এ (পুরোনো), ৩৩ (নতুন) রোড নম্বর ৩৩ (পুরোনো) ১১ (নতুন) চতুর্থ তলায় ২৩শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনতে ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ষষ্ঠ তলায় ২৩শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনতে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন আতাউর রহমান।
এ বিষয়ে ডা. আতাউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আপনার (প্রতিবেদক) মাথা ব্যথার কারণ কী? আপনি তো ভালো আছেন। এসব কথা শোনার সময় নেই আমার’ বলেই ফোন কেটে দেন।
সরেজমিন যা দেখা গেল: মিরপুর-১০ নম্বরে বারডেমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালের এনএইচএনের প্রধান কার্যালয়। সাত তলাবিশিষ্ট ভবনটিতে বসেন সিইও ডা. এম এ সামাদ ও সাবেক পরিচালক ডা. আতাউর রহমান। শুক্রবার ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রোগী দেখেন ডা. এম এ সামাদ। তার একচেটিয়া প্রভাবের কারণে হাসপাতালটিতে অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসক বসতে চান না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অনুদান ও জাকাতের টাকার ওপর ভর করে চলা বাডাসের প্রতিষ্ঠানে চলছে হরিলুট। রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসা ও টেস্ট বাবদ বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও লুটপাটের কারণে ৭০ বছরে বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বছরের পর বছর লোকসানি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে শীর্ষপর্যায়ের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের ভাগ্য বদল হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অর্থ হরিলুট করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন তারা।
এনএইচএনের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাত থেকে বছর বছর মোটা অঙ্কের অর্থ অনুদান পায় এবং নিজস্ব আয়ের গতিও বেশ ভালো। এরপরও বছরের পর বছর লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ ল্যাবএইড, ইবনেসিনা, পপুলারের মতো হাসপাতালগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে; ভবনের পর ভবন উঠছে; নতুন নতুন হাসপাতাল তৈরি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উল্টো বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে খয়রাতি করতে হচ্ছে। আর এ খয়রাতির সব টাকা চলে যাচ্ছে শীর্ষ চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের পকেটে।’
এনএইচএনের আওতাধীন হাসপাতালগুলোর আয়: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসের (জুলাই ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬) এনএইচএনের আওতাধীন রাজধানীসহ সারা দেশে ৯টি হাসপাতালের আয়ের হিসাবে দেখা গেছে, মিরপুর ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ৯ কোটি ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, ওয়ারী ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ১৬ কোটি ২৮ লাখ ৪৬ হাজার, উত্তরা মা ও শিশু হাসপাতালে ৫ কোটি ৫৫ লাখ ১২ হাজার, ধানমন্ডি ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ৫ কোটি ১৫ লাখ ৯৮ হাজার, চন্দ্রা ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ৩ কোটি ৩ লাখ ২৬ হাজার, মেঘনাঘাট ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ১ কোটি ৭১ লাখ ১১ হাজার, কুমিল্লা হাসপাতালে ৯১ লাখ ৭২ হাজার, ফুটকেয়ার ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে ৪ লাখ ৬৩ হাজার এবং ফেনী তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা আয় হয়েছে। হাসপাতালগুলো থেকে ১০ মাসে মোট ৪২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা আয় হয়।
এনএইচএনের আওতাধীন সেন্টারগুলোর আয়: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এনএইচএনের অধীনে থাকা সেন্টার ২৩টি। এসব সেন্টারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসে আয় হয়েছে ৩২ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে উত্তরা সেন্টারে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৪৮ হাজার টাকা; রামপুরা সেন্টারে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৭৪ হাজার, বসুন্ধরা সেন্টারে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার, শান্তিনগর সেন্টারে ৬৪ লাখ ৪৭ হাজার, গেন্ডারিয়া সেন্টারে ৮৪ লাখ ৪৯ হাজার, নওয়াব গার্ডেন সেন্টারে ৪৬ লাখ ১৯ হাজার, লালবাগ সেন্টারে ১৮ লাখ ৯১ হাজার, সফিপুর সেন্টারে ২০ লাখ ৩২ হাজার, ঘোড়াশাল সেন্টারে ২৮ লাখ ৬৪ হাজার, আতাউল তাহেরুন সেন্টারে ১০ লাখ ২৩ হাজার, খাগান সেন্টারে ৭ লাখ ৫৩ হাজার, হায়াতুজ্জামান ইব্রাহিম হেলথ সেন্টারে ৩৩ লাখ ৭৯ হাজার, উত্তরা হেলথ চেকআপ সেন্টারে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৩৫ হাজার, বাসাবো সেন্টারে ৩ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার, গুলশান সেন্টারে ২ কোটি ২১ লাখ ৮৫ হাজার, জুরাইন সেন্টারে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার, কেরানীগঞ্জ সেন্টারে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫২ হাজার, মোহাম্মদপুর সেন্টারে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৯৩ হাজার, সাভার সেন্টারে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৭১ হাজার, টঙ্গী সেন্টারে ১ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার, ডাক্তার লস্কর ইব্রাহিম হেলথ সেন্টারে ২ লাখ ৬ হাজার, নিকেতন সেন্টারে ৪৬ লাখ ৫১ হাজার এবং আদাবর সেন্টারে ৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা আয় হয়। এ ছাড়া একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ১০ মাসে আয় ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যু: এনএইচএনের আওতাধীন উত্তরা মহিলা ও শিশু হাসপাতালে ২০২৫ সালে ভুল চিকিৎসায় এক দিনে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। ওই সময়ে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে ঘটনাটির মীমাংসা করা হয়। এনএইচএনের গরিব রোগীদের চিকিৎসা বাবদ ফান্ড থেকে টাকা দেওয়া হয়। উত্তরা আব্দুল্লাপুরে বাডাসের ‘মা ও শিশু’ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে সোহাগ চৌধুরী নামে ভুক্তভোগী ভিডিওতে বলছিলেন, ‘হাসপাতালে লাশ পড়ে আছে। মা ও শিশু হাসপাতাল আব্দুল্লাহপুরে এমআরআই করতে এসে রোগী মারা গেছে। আমাদের রোগীর রক্ত বন্ধ করতে পারেনি, সে-ও মারা গেছে।’ ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রোগীর আত্মীয়স্বজনরা হাসপাতালে আহাজারি করছেন। ওই সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সদস্যরা।
ফেনীতে হাসপাতাল বন্ধ: সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট্রি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এম এ কাশেম ২০১৭ সালে তার ছেলের নামে ফেনীর ছাগলনাইয়া শহরে এনএইচএনকে তিন তলাবিশিষ্ট ‘তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতাল’ করে দেন। কিন্তু এনএইচএনের তদারকির অভাবে হাসপাতালটি গত জুনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটির জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ ছিল। হাসপাতাল বন্ধ হলে অ্যাম্বুলেন্স দুটি ঢাকায় ব্যবহার করা হচ্ছিল। কয়েকদিন আগে অ্যাম্বুলেন্স দুটি এম এ কাশেমের লোকজনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অনুদানের টাকায় চন্দ্রায় পাঁচ তলাবিশিষ্ট ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল হেলথ হাসপাতাল করে দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতালটির অবস্থাও ভঙ্গুর। সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের অনুদানের টাকায় কুমিল্লার বিষ্ণপুরে এনএইচএনের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট হাসপাতাল করা হয়েছে। হাসপাতালটির নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) খুলে ঢাকার বসুন্ধরা ডায়াবেটিক সেন্টার, উত্তরা মহিলা ও শিশু হাসপাতালে লাগানো হয়েছে। কুমিল্লা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ।