ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। তবে এর আগে টিকে থাকতে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় ওই সরকারের পেটুয়া বাহিনী। পাশাপাশি মাঠে ছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। তারাও ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অবৈধ ও লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্র-যুবলীগের গুলিতে অসংখ্য মানুষ শহীদ হন। আহত হন অনেকে। অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অস্ত্রধারীদের অনেকেই অধরা। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। শুধু তাই নয়, হামলায় কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশ সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছরে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নামে প্রায় ১০ হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলন দমনে ওইসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাই পথে আনা অনেক অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। গত দুই বছরে এসব অস্ত্র উদ্ধারের কাজের খুব একটা অগ্রগতি নেই। হামলা ও গুলিবর্ষণে যুক্ত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েক হাজার সশস্ত্র ক্যাডারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং প্রধান কয়েকটি মহানগরীতেই কয়েকশ ক্যাডার সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু আইনের আওতায় এসেছে খুবই কমসংখ্যক ক্যাডার। ভিডিও ফুটেজে প্রকাশ্যে পিস্তল, শটগান ও কাটা বন্দুক হাতে গুলি চালাতে দেখা যাওয়া অনেক অস্ত্রধারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আসিফ আহমেদ সরকার মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই মোহাম্মদপুরের বসিলায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান ওরফে রাজীব। সরকার পতনের পর তিনিও দেশ ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ঢাকার মিরপুরে রিভলভার দিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে সাবেক সংসদ-সদস্য এসএম জাহিদকে। তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। ৩ আগস্ট এক ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে কাওরান বাজারে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি করছেন কয়েকজন। তাদের কেউই ধরা পড়েনি।
৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে গুলি চালান জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলু। সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে পিস্তল হাতে গুলি চালান যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী। সরকার পতনের আগেই তিনি ভারত হয়ে দুবাই চলে যান। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম জামালখান ও আসকার দীঘির পাড় এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপ-সমাজ সেবা সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম চৌধুরী রিন্টুসহ অনেকে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা চালান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এরই মধ্যে শৈবালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। শৈবাল দাস সুমন এবং সশস্ত্র সহযোগীদের কেউই এখনো গ্রেফতার হননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭ ও ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি চলে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের নেতৃত্বে। শামীম ওসমান ছাড়াও তার ছেলে অয়ন ওসমান, বড় ভাই নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমান, শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, বেয়াই সালাউদ্দিন লাভলু, অয়নের শ্যালক ভিকি, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদসহ অনেককেই দেখা গেছে অস্ত্র হাতে। এদের সবাই বিদেশে পালিয়েছেন।
২১ জুলাই সাভারে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মেহেদী হাসান তুষার। ২৩ জুলাই সাভারে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করে ছাত্রলীগের সাভার উপজেলা সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক। ১৮ জুলাই সাভারে এমআইএসটি শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিনকে গুলির পর সাঁজোয়া যান (এপিসি) থেকে ফেলে দেওয়ার আলোচিত ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তারা দুজনই অভিযুক্ত। কিন্তু কেউই এখনো গ্রেফতার হয়নি। ৩ আগস্টের এক ফুটেজে দেখা যায়, ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করছেন সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের অপর সদস্য সাইদুর রহমান সুজন। গত বছরের ২০ জানুয়ারি তাকে গ্রেফতার করা হয়। কারাবন্দি অবস্থায় গত বছরের ২৫ জুন তার মৃত্যু হয়। ১৯ জুলাই তৎকালীন সংসদ-সদস্য হাবিব হাসানের নেতৃত্বে রাজধানীর উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় জাতীয় শ্রমিক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি আল মামুন মিয়া ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মোতালিব গ্রেফতার হলেও অন্যরা অধরা।
ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনকারীদের ওপর ১৫ রাউন্ড গুলি চালান আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপকমিটির সদস্য মাহবুব হাসান কাবুল। তাকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। রাজধানীর হাজারীবাগ ও জিগাতলা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ২২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব হোসেন সঞ্জয়। ভিডিও ফুটেজ দেখে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এদিকে ফেনীর মহিপালে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের ভয়াবহ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি পৌর যুবলীগের সহসভাপতি আলী আশরাফ ওরফে রুবেল হাজারী গত রোববার গ্রেফতার হয়েছেন।
চট্টগ্রাম নগরে আন্দোলন দমাতে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মহড়া যুবলীগের হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর এবং ছাত্রলীগের মো. ফিরোজ। ফিরোজ গ্রেফতার হলেও বাবর গ্রেফতার হয়নি। চট্টগ্রামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় পুলিশ ৪৬ জনকে শনাক্ত করলেও গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ২০ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরে মিডিয়া শাখা জানিয়েছে, ঢাকাসহ সারা দেশে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৯৯টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষ হয়েছে ১০০টির। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৬৩টির। ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে এফআরটি ৩৭টিতে। এছাড়া হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার ঘটনায় আরও ১০৬৩টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৫৪টির।
ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় কত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, তৎকালীন সরকারদলীয় কতজন ক্যাডার জড়িত ছিল, কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, হামলায় ব্যহৃত অবৈধ অস্ত্রের কতগুলো উদ্ধার হয়েছে-এসব বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকদিন ধরে যোগাযোগ করা হচ্ছিল পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সদর দপ্তর ও মিডিয়া সেন্টারে। সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখা থেকে জানানো হয়, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংশ্লিষ্ট শাখায় নেই। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘আপনার চাহিদার প্রেক্ষাপটে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে ২০-২৫ দিন সময় লাগবে।’