Image description

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কেবল একটি কার্ড নয়, এটি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। ব্যাংক হিসাব খোলা, সিম কার্ড নিবন্ধন, ট্যাক্স দেওয়া, জমি রেজিস্ট্রি কিংবা পাসপোর্ট গ্রহণ—সবক্ষেত্রেই এনআইডি অপরিহার্য। তাই এই পরিচয় যদি অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারে, তবে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং পুরো জাতীয় পরিচয় কাঠামোর নিরাপত্তাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

 

ময়মনসিংহে এমনই এক অভিনব পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। মো. তোফায়েল আহামেদ (২৪) নামে এক যুবকের এনআইডি নম্বর, নাম ও পিতা-মাতার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য এক ব্যক্তি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

ভুক্তভোগী তোফায়েল আহামেদ ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ভাটি সাভার গ্রামের বাসিন্দা। জানা গেছে, বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ২৬ জুলাই ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে যান তিনি। সেখানে বায়োমেট্রিক (ছবি ও আঙুলের ছাপ) দেওয়ার সময় কর্মকর্তারা জানান, তার এনআইডি ব্যবহার করে আগেই একটি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। এতে নতুন আবেদন গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন তারা।

 

কর্মকর্তাদের কথা শুনে হতবাক হয়ে যান তোফায়েল। কারণ, তিনি এর আগে কখনোই পাসপোর্টের আবেদন করেননি। পরে তিনি ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতা এড়াতে এবং ঘটনার তদন্ত চেয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) আবেদন করেছেন।

 

অভিযোগে তোফায়েল উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টটি ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পশ্চিম ঢাকার একটি পাসপোর্ট অফিস থেকে বিতরণ করা হয়েছে। তার অজান্তেই এনআইডি ব্যবহার করে প্রতারক চক্র এই পাসপোর্ট তৈরি করেছে, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

 

এদিকে, নথিপত্র পর্যালোচনায় উঠে এসেছে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাসপোর্টে আবেদনকারীর নাম ‘তোফায়েল আহামেদ’ লেখা থাকলেও গ্রহীতার স্বাক্ষরের স্থানে লেখা রয়েছে ‘টুপায়েল’। একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে নাম ও স্বাক্ষরের এমন বড় অসঙ্গতি কীভাবে পার পেয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠন ‘ময়মনসিংহ মঞ্চ’-এর সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরি করা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি বা অন্য যেকোনো অপকর্ম হতে পারে। অন্যদিকে প্রকৃত নাগরিকও পরবর্তীতে বিদেশে গমন বা আইনি জটিলতায় চরম ভোগান্তিতে পড়বেন।

 

বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে এনআইডি/জন্মনিবন্ধনের তথ্য, আঙুলের ছাপ, ছবি ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের মতো বহুধাপের নিরাপত্তা যাচাই পার হতে হয়। পাসপোর্ট বিতরণের সময়ও সশরীরে গ্রহীতার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। এত যাচাই-বাছাইয়ের পর কীভাবে অন্য কেউ তোফায়েলের এনআইডি দিয়ে পাসপোর্ট তুলে নিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা। অপরাধ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি ও পাসপোর্ট আইনের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার দাবি উঠেছে।

 

ভুক্তভোগী তোফায়েল আহামেদ বলেন, আমার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ কীভাবে পাসপোর্ট তৈরি ও সংগ্রহ করল, তা ভেবেই আমি আঁতকে উঠছি। আমি চরম উদ্বেগের মধ্যে আছি। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

 

ঘটনার বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আশিষ কুমার দাসের সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য এক কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, তোফায়েল আহামেদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে এর মধ্যেই অন্য এক ব্যক্তি পাসপোর্ট তুলে নিয়েছেন। তোফায়েল নতুন পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে এলে বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে ওই পাসপোর্টটি ময়মনসিংহ অফিস থেকে ইস্যু করা হয়নি।

 

তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটল তা তদন্ত করতে লিখিত অভিযোগটি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। তদন্ত শেষে আসল ঘটনা জানা যাবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই কঠোর ব্যবস্থা নেবে।