Image description
কাউন্সিলর একরাম হত্যা

রাত ১১টা পার হলেও বাসায় ফেরেননি বাবা। উদ্বিগ্ন কিশোরী মেয়ে মোবাইলে কল দিয়ে শুনতে পেল বাবার আতঙ্কিত কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর। মেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে...!’ এই কথা শুনেই মেয়ের হাত থেকে মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেন মা। কয়েকবার বললেন— হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো। ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ নেই। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সংযোগটি। আবার কল করলেন, রিসিভও হলো। কিন্তু কথা বলল না কেউ। দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলেন মা। এরপর ফোনের ওপাশ থেকে শোনা গেল আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার টানার শব্দ। তারপর দুই রাউন্ড গুলির আওয়াজ। গোঙানির শব্দ। ‘ওহ আল্লাহ’ বলে আরশ কাঁপানো কান্না মোবাইলের এ-প্রান্তে।

আট বছর আগে ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ থানার মেরিন ড্রাইভ সড়কে র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছিলেন পৌর কাউন্সিলর ও তৎকালীন যুবলীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা একরামুল হক। মৃত্যুর আগমুহূর্তের এ দৃশ্যপটটি ধারণ হয়েছিল একরামের সচল থাকা মোবাইলের সঙ্গে কলে যুক্ত থাকা তার স্ত্রী আয়েশা বেগমের মোবাইলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ অডিও রেকর্ড শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল দেশের মানুষ।

ওই বছরের ৪ মে ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’— এমন স্লোগান দিয়ে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। অভিযানের ২২ দিনের মাথায় একরাম নিহত হন। র‌্যাব দাবি করেছিল, একরাম ইয়াবার গডফাদার। মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গোলাগুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে।

কথিত ক্রসফায়ারের এ ঘটনা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি মর্মস্পর্শী দলিল হয়ে আছে। কিন্তু বিচার দূরে থাক, একরামের স্ত্রী-পরিবার মামলাও করতে পারেনি। স্বামীহারা স্ত্রী আর বাবাহারা দুই মেয়ে টুঁ শব্দও করতে পারেননি সে সময়।

আয়েশা জানালেন, আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকে ফোন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে একরামের মৃত্যুর বিষয়ে কোনো কথা না বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তিনি বললেন, ‘আমার হাজবেন্ডকে মেরে ফেলার পাঁচ দিন পর আমি সংবাদ সম্মেলন করে অডিও রেকর্ডটি প্রকাশ করি। এটা নিয়ে সারা দেশে একটা প্রতিক্রিয়া হলো। এর কয়েক দিন পর রমজান মাসে দুই মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন করেন। তারা আমাকে চুপ থাকতে বললেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আমি যেন কোনো কথা না বলি।’

‘আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যাবেন বলেছিলেন, যা বলার প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে তারা আর নিয়ে যাননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে উনি মিথ্যা আশ্বাস দিলেন। আমরা আর কী করতে পারি’— যোগ করলেন আয়েশা।

সরকারের প্রভাব ও প্রাণের ভয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে আয়েশা বললেন, ‘একরামকে খুন করার পর প্রায় এক বছর র‌্যাবের লোকজন সিভিল ড্রেসে আমাকে ফলো করত। আমি মেয়েদের নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় পেছনে মোটরসাইকেলে লোক থাকত। র‌্যাবের এক কর্মকর্তা একদিন বিকাল ৩টায় আমাদের বাসায় এসে রাত ১১টা পর্যন্ত বসেছিলেন। বললেন, ‘আপনি তো মেয়ে নিয়ে স্কুলে যান। আপনারও ক্ষতি হতে পারে।’ আমি বললাম, ‘আমার স্বামীকে আপনারা মেরে ফেলেছেন। আমাকে আর মৃত্যুর ভয় দেখাবেন না।’

একরামের মৃত্যুর পর থানায় গেলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। এরপর আদালতে মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আয়েশা জানালেন, যে আইনজীবীকে মামলা করার দায়িত্ব দেওয়া হতো, র‌্যাবের লোকজন তার চেম্বারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। পরদিন তিনি মামলা ফেরত দিতেন। বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে এমন ঘটনার পর কেউ আর মামলা নিতে রাজি হননি।

একপর্যায়ে বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন বলেও জানালেন আয়েশা। সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। আমরা তো আর তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব না। বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা আয়েশা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলা করতে বলেন। কিন্তু একরামের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা কেউ মামলা করতে রাজি হননি।

২০২৫ সালের রমজানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিমের কাছে গিয়ে জবানবন্দির পাশাপাশি নথিপত্র জমা দেন। এপ্রিলে তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেন।

এরপর গত ২৬ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে একরামুল হক হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় ট্রাইব্যুনালে। অভিযুক্ত অন্যরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক সংসদ সদস্য বদিউর রহমান বদি, র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান তুষার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম মিনু, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন ওরফে রাজন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ ওরফে রাজু এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত। তাদের মধ্যে আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান ও মাহবুব আলম অন্য মামলায় কারাগারে আছেন।

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং গ্রেপ্তার থাকা তিনজনকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। সবশেষ গত সোমবার রাতে র‌্যাব-৭-এর তৎকালীন অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে হেফাজতে নিয়েছে সেনাবাহিনী।

একরামুল হক টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতিও ছিলেন তিনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায়ও তার নাম ছিল।

আয়েশা বেগমের অভিযোগ, টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য ‘ইয়াবা গডফাদার’ আবদুর রহমান বদির রোষানলের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে একরামকে। এর পেছনে আছে দুজনের রাজনৈতিক বিরোধের প্রায় এক দশকের ইতিহাস। আয়েশা বলছিলেন, ‘বদি এমপি হয়েই আমাদের ডিস্টার্ব শুরু করেন। আমার আব্বার জায়গা দখলের চেষ্টা করেন। ২০০৯ সালে আব্বা মারা যান। ২০১০ সালে টেকনাফ পৌরসভায় আমাদের কিছু জায়গা বদি জোরপূর্বক দখল করে নেন। সেখানে ঘর তোলেন বদি। সেই ঘরে ওবায়দুল কাদের অনেকবার গেছেন। প্রথমে বদির সঙ্গে আমার স্বামীর রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। জায়গা দখলের পর বিরোধ আরও বাড়ে। বদি দুদককে দিয়ে হয়রানি করে। যদিও দুদক তদন্ত করে কিছুই পায়নি। এরপর ইয়াবা ব্যবসায়ীর লিস্টে নাম তুলে দেন।’

আবদুর রহমান বদির সঙ্গে যোগসাজশে র‌্যাব ক্রসফায়ারের নামে একরামকে হত্যা করেছে বলে স্পষ্ট অভিযোগ আয়েশার। তিনি বললেন, ‘আবদুর রহমান বদি, ওবায়দুল কাদের, কামাল, শেখ হাসিনাসহ সব আসামির আমি ফাঁসি চাই। আমার স্বামী আওয়ামী লীগ করতেন। আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই এখনো আওয়ামী লীগ করেন। কিন্তু আমি আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করি।’