‘কোন দেশে গেছে আমার ছেলে... ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে পারে না... মোবাইলে দেখি আগুন আর আগুন...।’ এই বিলাপ করছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদরের আলী মিয়া। সন্তানের মৃত্যুর খবর যেভাবে পেলেন, বলছিলেন সে কথা।
আলীর ছেলে আপন আহমেদ (২৩) দক্ষিণ আফ্রিকায় ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনে একটি দোকানে লাগা আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তার সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন দোকানে থাকা ছয় বাংলাদেশি। এর মধ্যে আপনসহ চারজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ সদরের ধলেশ্বরীর পাড়ের সবুজে ঘেরা আলীরটেক ইউনিয়নে।
আপন ছাড়া নিহত অন্যরা হলেন আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (১৯), মৃত শরব আলীর ছেলে নূর মোহাম্মদ (৫৫), তৈলখিরারচর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের মো. শাহিন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার মিরকাদিম পৌরসভার মৃত সালাম ব্যাপারির ছেলে মো. শাহিন (৩০)।
নিহত আপন আহমেদ
এমন মৃত্যুর খবরে শোকাতুর আলীরটেক ইউনিয়নের বাসিন্দারা। নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি।
ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে শোক আর ক্ষোভে চিৎকার করছিলেন আলী মিয়া। ‘সকাল থেকে বিদেশ থেকে কল আসে, মোবাইলে শুধু দেখলাম, আগুন আর আগুন। আগুন নাকি জ্বলতাছে আর জ্বলতাছে... সকালে আমার চাচাশ্বশুর খবর নিয়ে আসছেন, আমার ছেলে আপন যে দোকানে কাজ করত, সেখানে আগুন লাগছে। কোন দেশে গেছে আমার ছেলে, এখনো আগুনই নাকি জ্বলছে, ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে পারে না’— বলছিলেন তিনি।
আলী জানালেন, অভাবের সংসার চালাতে চার বছর আগে স্থানীয় মেম্বারের দক্ষিণ আফ্রিকার দোকানে কাজ করতে যান আপন। ‘এই পেটের অভাবে আমার পোলায় যেই কষ্ট করছে... পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত আমার ছেলে। জীবনে বহুত কষ্ট করছোস বাবা। আমার সেই ছেলেটারে আল্লাহ নিয়া গেল...’, হাহাকার আলীর।
নিহত ফাহিমদের বাড়িতে সান্ত্বনা দিতে জড়ো হয়েছেন এলাকার লোকজন। সেখানে কথা হলো ফাহিমের এক আত্মীয়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ১১ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল ফাহিম। বিকাল পর্যন্ত তার মরদেহ বের করা যায়নি বলে খবর পেয়েছেন তারা।

পুড়ে যাওয়া দোকানটি আলীরটেক ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার রওশন আলীর। তিনি এখন দেশেই। রওশন বললেন, ‘দুপুরের দিকে জানতে পেরেছি, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমার দোকানে আগুন লেগেছে। তখন দোকানে সাতজন কর্মচারী ছিল, ছয়জনই স্পট ডেড। আমি ভিডিওকলে দেখেছি, আগুন এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না নিশ্চিত নই। এখনো আগুন বন্ধ হয়নি।’
‘মারা যাওয়া সবাই আমার দোকানে কাজ করত। আমরা সবাই শোকাহত, সবাই দোয়া করেন। আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি’— যোগ করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বললেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো বার্তা পাইনি। নানা মাধ্যমে জানতে পেরেছি, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’
সংবাদমাধ্যম থেকে খবরটি জেনেছেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী। ‘আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে পেরেছি। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা আমরা পাইনি। সংশ্লিষ্ট থানায় বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে’— বললেন তিনি।