Image description

সিলেট-১০ কূপ খননের পর নির্মাণ করা হয় একটি বড় পাইপলাইন। উৎপাদনও শুরু হয়। তবে মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই দেখা দেয় জটিলতা। কূপ থেকে গ্যাসের সঙ্গে পানি ও বালু উঠতে শুরু করে। একই সঙ্গে কমে যায় কূপের চাপ। এতে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

এ পরিস্থিতিতে কূপটির পাশেই সিলেট-১০ এক্স নামে নতুন একটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এটি সফল হলে সিলেট-১০ ও সিলেট-১০ এক্স মিলিয়ে ১০৬ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ পাওয়া যাবে। প্রথম পাঁচ বছর প্রতিদিন ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরবর্তী পাঁচ বছর প্রতিদিন ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত সমীক্ষা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও কেন একটি কূপ থেকে এত দ্রুত পানি ও বালু উঠতে শুরু করল। তাহলে কি সমীক্ষায় কোনো গলদ ছিল? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারিগরি বা ভূতাত্ত্বিক কারণ?

এ বিষয়ে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ আগামীর সময়কে জানালেন, গ্যাসকূপে সবসময়ই অনিশ্চয়তা থাকে। এ ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়েই কাজ করতে হয়। ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

‘সিলেট-১০ নম্বর কূপ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কূপটি সচল করতে দুইবার চেষ্টাও করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি চালু না-ও হতে পারে।’—যোগ করেন তিনি।

সূত্র বলছে, সিলেট-১০ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০২ কোটি ১০ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫১৭ কোটি টাকা। এখন দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় কমিয়ে ৪৭৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। সর্বশেষ মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৪৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ সময়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেট-১০ নম্বর কূপের খনন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চীনের সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কূপটির কমপ্লিশন কাজ শেষ করে। এরপর কূপ থেকে হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রের প্রসেস প্ল্যান্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। পাইপলাইন নির্মাণ শেষে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়।

প্রায় ১ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলনের পর কূপ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি ও বালু উঠতে শুরু করে। একই সঙ্গে কূপমুখের চাপও কমে যায়। এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কূপটির গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এদিকে নতুন কূপ হিসেবে সিলেট-১০এক্স খননের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের সিএনপিসি চুয়ানকিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ৩ হাজার ৩৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত কূপ খনন করে।

কূপটিতে চারটি ড্রিল স্টেম টেস্ট (ডিএসটি) পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষায় দৈনিক ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রবাহের সম্ভাবনা পাওয়া যায়। প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে প্রায় ১৯ ব্যারেল কনডেনসেটও মিলেছে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের আওতায় সিলেট-১০ কূপ থেকে ১ বিসিএফ গ্যাস এবং সিলেট-১০ এক্স কূপ থেকে ১০ বছরে দৈনিক গড়ে প্রায় ৮ মিলিয়ন ঘনফুট হারে মোট ২৯ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলমান প্রকল্পের আওতায় টার্ন-কি ভিত্তিতে সিলেট-১০ নম্বর কূপ খনন অপারেশন কাজের বিপরীতে ১৫ কোটি ৯ লাখ ৫৬ হাজার ২২০ মার্কিন ডলার (ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া) ও ১২ কোটি ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকায় খনন ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়। এরই মধ্যে খনন ঠিকাদারকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩২৩ মার্কিন ডলার প্রতি মার্কিন ডলার ১১০.০০ থেকে ১২১.৫৬ টাকা হারে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮০ কোটি ১২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী ডিমোবিলাইজেশন কাজের ৫০ শতাংশ বিল রিগ ও অন্যান্য পুনঃরপ্তানিযোগ্য সরঞ্জাম বাংলাদেশ থেকে সরানোর পর পরিশোধ করার কথা ছিল। তবে সিলেট-১০ নম্বর কূপে ব্যবহৃত রিগ পরে সিলেট-১১ নম্বর কূপে ব্যবহার করা হয়। ফলে ডিমোবিলাইজেশন বাবদ কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি।

এ পর্যন্ত পরিশোধিত বিলের বিপরীতে ভ্যাট বাবদ ২১ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার এবং আয়কর বাবদ ৯ কোটি ৬৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সিলেট-১০ এক্স কূপের খনন অপারেশনের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৪ মার্কিন ডলারের চুক্তি করা হয়। এরই মধ্যে ভ্যাট ও আয়করসহ ১ কোটি ২৩ লাখ ২১ হাজার ৭১২ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৫৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বাড়ায় বাকি বিল পরিশোধে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য বিনিময় হার বিবেচনায় প্রতি ডলারের মূল্য ১২৬ টাকা ধরে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এতে সিলেট-১০ এক্স কূপের খনন অপারেশন বাবদ ভ্যাট ও আয়করসহ সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২১১ কোটি ৩৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে মালামাল, প্রকৌশল সেবা, পূর্তকাজ, মোবিলাইজেশন, ডিমোবিলাইজেশন ও খনন অপারেশন সেবাসহ এ খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এটি প্রথম সংশোধিত ডিপিপির তুলনায় প্রায় ৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা কম।

এদিকে সিলেট-১০ এক্স কূপের জন্য ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপের পাইপলাইন নির্মাণের সংস্থান রাখা হয়েছিল। তবে সিলেট-১০ কূপের উৎপাদন বন্ধ থাকায় নতুন কূপের গ্যাস ওই কূপের বিদ্যমান পাইপলাইন দিয়েই হরিপুরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারিগরি কমিটির এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করায় নতুন পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন পড়ছে না। এতে প্রকল্প ব্যয়ও কমছে।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ভূঁইয়া পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় জানালেন, বিদেশি পরামর্শকদের আপ্যায়ন, থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কম হওয়ায় কনসালট্যান্সি খাতে ব্যয়ও কমেছে। দুই কূপের জন্য এ খাতে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ১০ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি মূল ডিপিপির তুলনায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা কম। এসব কারণেই দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের মোট ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এর আগে, এ বিষয়ে তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আগামীর সময়কে বলেছিলেন, দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান দিয়েই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালানো উচিত।

তিনি বললেন, অনুসন্ধানে ঝুঁকি থাকলেও সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবেও কোনো প্রতিষ্ঠান শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।