Image description

সকালের বাজার তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। রাজধানীর ধূপখোলার মাছ বাজারের সারির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পাঙ্গাস মাছের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রিকশাচালক আবদুস সাত্তার। দাম জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর মাছের দোকান ছেড়ে চলে গেলেন ডিমের দোকানে। শেষ পর্যন্ত মাছ নয়, এক ডজন ডিম কিনেই বাজার শেষ করলেন।

টাইমস অব বাংলাদেশকে সাত্তার বলেন, `আগে সপ্তাহে এক-দুই দিন বাচ্চাদের জন্য পাঙ্গাস কিনতাম। এখন ২০০-২২০ টাকা কেজি দামের মাছ কেনার সাহস পাই না। সবজির দামও বেশি। কী কিনব, সেটাই বুঝে উঠতে পারি না।’

ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ঘুরে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, দিনমজুর, হকার ও স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীরা। একসময় নিম্ন আয়ের মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা আমিষের উৎস ছিল পাঙ্গাস। এখন সেই মাছও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাজারে সাত্তারের মতো মানুষের সংখ্যাটি কম না। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশ করা ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি ১০ জন মানুষের চারজনেই তারই মতো বিপাকে। এই প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বাংলাদেশির। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশে এ হার সবচেয়ে বেশি।

প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা বলতে এমন খাবারকে বোঝানো হয়েছে, যা প্রতিদিন মাথাপিছু ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তি সরবরাহ করে। এর মধ্যে শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ, বাদাম ও বীজ, শাকসবজি, ফলমূল, তেল-চর্বি—এই ছয়টি খাদ্যগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন বা ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেননি। অর্থাৎ বাংলাদেশের পরিস্থিতি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে খারাপ।

শুক্রবার রাজধানীর সোয়ারীঘাট, রায়সাহেব বাজার, সূত্রাপুর ও ধূপখোলা বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাঙ্গাস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। পাঙ্গাসের মতোই এক সময়ের সস্তা তেলাপিয়ার দাম ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা।

মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বড় রুই ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ধূপখোলা বাজারের মাছ বিক্রেতা মুক্তার মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমেছে। তাই এই সপ্তাহে চাষের মাছের দাম আরও বেড়েছে।’

বাংলাদেশে মাছ কেটে বিক্রির প্রবণতা নেই। ফলে আস্ত মাছ কিনতে হয়, যা নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই মাছ না কিনেই ফিরে যান।

রায়সাহেব বাজারের হকার মুমিন বলেন, ‘আগে ১৫০ টাকার পাঙ্গাস কিনে চারজন খেতে পারতাম। এখন সেই টাকায় আধা কেজিও হয় না। বাচ্চারা মাছ চাইলে কী বলব?’

‘মাছ কিনলে সবজি কেনা যায় না’

সূত্রাপুর বাজারে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রওশন বেগম মাছের দোকান এড়িয়ে সবজির দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু বেগুনের কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ও বরবটি ৭০ থেকে ১০০ টাকা, কোনটা নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন।

কাঁচা মরিচের কেজি ৩২০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আলু ভর্তাও এখন দামি। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, টানা বৃষ্টিতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির দামও বেড়েছে।

রওশন বলেন, ‘মাছ কিনলে সবজি কেনা যায় না। শুধু সবজি কিনেই সংসার চলে না। এখন যা একটু কম দামে পাই, সেটাই কিনে বাড়ি ফিরি।’

ডিমেও সেখানেও স্বস্তি নেই

আমিষের স্বস্তা বিকল্প হিসেবে পরিচিত ডিমও গত চার বছর ধরেই দামি হয়ে উঠেছে। মাঝে দাম কিছুটা কমলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যার পর এর দামও দিয়েছে লাফ। বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকায়।

ব্রয়লার মুরগির কেজিও দুইশ টাকা ছুঁই ছুঁই, সোনালি মুরগি ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা। গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা।

রায়সাহেব বাজারে দিনমজুর মুমিনুল হক বলেন, ‘আগে সপ্তাহে দুই দিন মাছ কিনতাম। এখন মাসে একবার কিনতেও কষ্ট হয়। মাংস তো এখন আর কেনার কথা ভাবতেই পারি না, ওটা একেবারে পাত থেকেই উঠে গেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বস্তি এলাকার ৪৬ শতাংশ পরিবার মৃদু, ২১ শতাংশ পরিবার মাঝারি এবং ১২ শতাংশ পরিবার তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।