নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার উপকূলে মেঘনা মোহনায় জেগে ওঠা নতুন নতুন ডুবোচর ঘিরে সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী ভূমি ব্যবসায়ী ও ভূমিদস্যুরা রাতারাতি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করছে। এতে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর খাসজমি, আর প্রকৃত ভূমিহীনরা পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস ধরে নতুন জেগে ওঠা বিভিন্ন চরে ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঘর বসবাসের জন্য নয়; বরং ভবিষ্যতে জমির মালিকানা বা দখল প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবেই নির্মাণ করা হচ্ছে। দিনের বেলায় অধিকাংশ ঘর ফাঁকা পড়ে থাকলেও রাতে লোকজন এসে অবস্থান নেয়। আবার কিছু ঘর নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। তাদের অভিযোগ, এগুলো মূলত সরকারি জমি দখলের পূর্বপ্রস্তুতি।

স্থানীয় মাঝি খোকন জলদাস বলেন, ‘সরকার যদি প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করতে চায়, তার আগেই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঘর তুলে পুরো এলাকা দখল করে ফেলছেন। এতে প্রকৃত অসহায় মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
আরেক বাসিন্দা হোরণ বলেন, ‘নতুন জেগে ওঠা চর এখনও পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই সুযোগে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক এনে ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করে দখল নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এসব দখল উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়বে। পরে বিভিন্ন নামে-বেনামে বন্দোবস্তের মাধ্যমে এসব জমি ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
চর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতে, নতুন চর স্থিতিশীল হওয়ার আগে সেখানে বসতি স্থাপনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী চক্র অসহায় মানুষকে ব্যবহার করে সেখানে বসতি গড়ে তুলছে। সরকার সময়মতো নতুন চর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে না নেওয়ায় অপরিকল্পিত ও অনিরাপদ বসতি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জানা গেছে, নোয়াখালী ও হাতিয়ার নতুন চরগুলোতে জমি দখল নতুন কোনো ঘটনা নয়। চর জেগে উঠলেই প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিভিন্ন কৌশলে জমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে এসব জমিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মামলা-মোকদ্দমা এবং সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন চর শুধু নতুন জমি নয়; ভবিষ্যতে কৃষি, বসতি ও জীবিকার জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদ। তাই শুরু থেকেই দখলমুক্ত রেখে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভূমিসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নতুন জেগে ওঠা চর সরকারি খাসজমি হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি জরিপ, রেকর্ড ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সেখানে স্থায়ী দখল প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। জোরপূর্বক ঘর নির্মাণ করে জমি দখলের চেষ্টা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বেলাল সর্দার বলেন, ‘এগুলো জমি দখলের জন্য নয়। চরাঞ্চলে চারণভূমি কমে যাওয়ায় গরু-মহিষ নিয়ে এখানে আসতে হয়। রাতের বেলায় রাখালদের থাকার জন্য অস্থায়ীভাবে কয়েকটি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুম শেষে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক জনপ্রতিনিধি বলেন, সরকারি জমি দখলের অভিযোগ সত্য হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন চরগুলোতে দ্রুত সরকারি জরিপ সম্পন্ন করে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি জোরদার, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং দখলচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাতিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিয়ুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি খাসজমি অবৈধভাবে দখলের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী উচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি জমি রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এর আগে চর আতাউরে একই ধরনের অভিযোগের পর পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও কেউ অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’